বিনোদন

স্মরণের জানালায় দাঁড়িয়ে থেকে

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

বাংলামটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ঠিক সামনে প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে দুদিন গিটার শেখান তিনি। ক্লাসের দিনগুলির বিকেল বেলায় এক অনন্য কোরাস শোনা যেত সেই গলির ভেতরে হাঁটলেই। সন্ধ্যা নাগাদ একদল তরুণ তরুণী গিটার কাঁধে বের হতো। আমি সেই ক্লাসের শেষ দিককার ব্যাচের ছাত্র। ভোরের কাগজে প্রদায়ক হিসেবে কাজ করি। তাই গিটার শেখার নেশাতেই তার কাছে যাই।তিনি এদেশের শুদ্ধ সুরের অনন্য শিক্ষক লাকী আখান্দ।  সামর্থ্য নাই। তিনি আমাকে বিনা পয়সায় গিটার শেখালেন। একটি পুরনো গিটার উপহার দিলেন। সেই ১৯৯৯ সাল থেকেই তাই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক। সেই থেকে আজš§ ঋণ মানুষটার প্রতি। এদেশে অগণিত সেশন মিউজিশিয়ান যারা  গানকেই পেশা হিসেবে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন। তাদের প্রায় শতভাগ সঙ্গীত কর্মীর প্রথম গান ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’। আজ এই বরেণ্য সঙ্গীতজ্ঞ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি এদেশের সঙ্গীতের মহীরুহ লাকী আখান্দ।   আমার গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায় একাধিক টিভি অনুষ্ঠানে তিনি এসেছেন অতিথি হয়ে। পুরনো ঢাকায় শিল্পীর নিজ বাড়ি থেকে তাকে নিয়ে আসতে হতো। এই যাত্রাপথে একবার এক সিএনজিতে করে লাকী ভাইকে নিয়ে একুশে টিভির দিকে রওনা হয়েছি। লাকী ভাই প্রায়শঃই অদ্ভুত সব খামখেয়ালী করতেন। সেই খেয়ালীপনা থেকেই সিএনজিতে বসেই আমায় ডেকোনা ফেরানো যাবে না’ গানটি খালি গলায় গাওয়া শুরু করলেন তিনি। কিছুক্ষণ পরপর সিএনজি চালক পেছনে ফিরে তাকান। অতঃপর জিজ্ঞেস করি এই গান শুনেছে কি না। এরপর যখন তিনি জানতে পারলেন সেই গানের স্রস্টা তার গাড়িতে। তিনি আর ভাড়া নিলেন না। বললেন,‘ ভাই আমি শুনছি এই গান নাকি কিশোর কুমারের। আপনিই সেই।’   এভাবে সাধারণ শ্রোতাদের চমকে দেবার অভ্যাস তার চিরকালের। খুব নিভৃতচারী থাকলেও লাকী আখান্দ তার গায়কী ও সঙ্গীত পরিবেশনার এক বনেদী স্টাইল ফলো করতেন। যেমন প্রতিটা শো’র ক্ষেত্রে আলাদা কোরাস ব্যবহার। অর্কেস্ট্রা করে স্টেজের গানে নতুনত্ব আনা। এ সবই একমাত্র লাকী আখান্দর গানের ক্ষেত্রেই দেখা যেতো। এদেশে প্রায় ১ ডজন শিল্পীদের নাম বলা যাবে যারা লাকী আখান্দের সুরারোপিত গানেই শিল্পী জীবনে ‘জনপ্রিয়’ তকমাটি লাগাতে পেরেছিলেন।    নব্বই দশকে সাউন্ডটেক একবার উদ্যোগ নিলেন লাকী আখন্দের সুরে সে সময়ের জনপ্রিয় ব্যন্ড তারকাদের অ্যালবাম বের করবেন। তখন প্রচলিত বাজারে খুব চটুল গানের বাজার। কিন্তু লাকী ভাই তার নিজস্ব মেলোডি দিয়েই গাওয়ালেন আইয়ুব বাচ্চু, জেমসের মতো তারকাদের নিয়ে। তিনি তার পারিশ্রমিক চেয়েছিলেন প্রচলিত বাজারের চেয়ে কয়েকগুণ। বাজি লেগে বলেছিলেন,‘আমি ফাজলামি করতে মিউজিক করি না। যা দিয়েছি কনফার্ম হয়েই দিয়েছি বলে বাজারে হিট হয়েছে। তাই সম্মানীর ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই।’এমনই দৃঢ় চিত্ত ছিলেন লাকী আখান্দ। এমন অগণিত স্মৃতি তাকে নিয়ে আমার।    মৃত্যুর কয়েকমাস আগে বড় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। দীর্ঘ চিকিৎসার সময়কালে শিল্পীরাও সাধারণ রোগী দেখার মতো করে মাঝে মাঝে দেখা করতে আসতেন। কিন্তু লাকী আখান্দ চাইতেন কেউ তার সাথে কয়েকবেলা গল্প করুক। এর ভেতরে এরশাদুল হক টিংকু ভাই তার সান্নিধ্যে থাকলেন ছায়ার মতো। লাকী আখান্দের খুব স্নেহভাজন সঙ্গীতশিল্পী তানভীর শাহিন আমেরিকা থেকে ঢাকায় এলে ওকে নিয়ে লাকী ভাইয়ের বাসায় যাই। প্রখর রোদের দুপুর। এক বিছানায় হারমোনিয়াম নিয়ে শুয়ে আছেন তিনি। আমরা তার জন্য খাবার নিয়ে গেছি। আমাদের দুজনকে দেখে প্রথমেই বললেন, ‘কথা দাও, প্রতিদিন তোমরা দুজন এক বেলা করে আমাকে সময় দেবে। আমার খুব গল্প করতে ইচ্ছে করে।’   এর পরপর দুদিন সারাবেলা গল্প আর গান চললো আমাদের। হাতে সেলাইন চেম্বার লাগানো। ঠিক মতো দাঁড়তে পারছেন না। কিন্তু গানের আলাপে কথায় কথায় হারমোনায়াম ধরে সেকী সুরের দৃপ্ততা! এই হলো আমাদের সুরপিয়াসী লাকী আখান্দ।    দুুদিন পরেই শরীরটা আরো খারাপ হয়ে গেল তার। হাসপাতালে ভর্তি হতে হলো। কিন্তু এর ভেতরে তানভীর শাহিন লাকী আখান্দের পুরনো সুরগুলো নতুন করে কম্পোজিশন করে গেয়ে একটি অ্যালবাম তৈরি করেছেন। সেটির প্রকাশনাতে লাকী ভাইকে নিয়ে যাবার প্ল্যান ছিল।  কিন্তু তার শারীরিক অবস্থা দেখে আমরা দুজনই সেই আশা ছেড়ে দিলাম। কারণ হাসপাতাল থেকে বের হবার কোনো পথ নেই। কিন্তু আমাদের প্ল্যানের কথা শুনেই তিনি বলেন তোমরা অ্যারেঞ্জ করো আমি যাবো অনুষ্ঠানে। মেডিকেলের ডাক্তার তার বাল্য বন্ধু। তুই তোকারি সম্পর্ক। ফোন করে বললেন‘ আমার সুরের অ্যালবাম। আামাকে যেতেই হবে। এসব স্যালাইন ফ্যালাইন  খুলতে বল। আমি অনুষ্ঠানে যাবো। ঠিক তার ৩ দিন পর কাকতালীয়ভাবে  অনুষ্ঠানের দিন লাকী ভাই বেশ খানিক সুস্থও হয়ে গেলেন এবং অবাক করার মতো তিনি প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এহেণ। এটিই ছিল তার সর্বশেষ কোনো অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া। এরপর হাসপাতাল থেকে আবার তার বাড়িতে নিঃসঙ্গ দুপুর গুনতে লাগলেন।    মৃত্যুর মাসখানিক আগের এক রাতে আমাকে হঠাৎ ফোন করে বললেন,‘ কাল তুমি আর শাহিন চলে আসো। আমি এখন সদরঘাটের দক্ষিণ পাশে আছি। দারুন হাওয়া বইছে। চলে এসো তোমরা! ’ আমি তো অবাক এত রাতে তিনি ওখানে কি করেন?    এর ঠিক ১ ঘন্টা পর আবার ফোন করে বললেন,‘ আমেরিকা কনসার্টের জন্য সব প্রস্তুতি নিচ্ছি। প্র্যাকটিস চলছে। তানভীর শাহিনকে বলো কাগজপত্র সব গুছিয়ে ফেলতে।’  পরে আবিস্কার করলাম শুধু আমি নই। লাকী আখান্দ তার শেষ জীবনে কাছের কয়েকজন সহচরকে ফোন করে এমনভাবে বলতেন যেন তিনি তখন সেই জায়গাটিতেই দাঁড়িয়ে আছেন। মূলত সুরের রাজা এই মানুষটি প্রচন্ডভাবে বাঁচতে চেয়েছিলেন। যেমনটি তিনি বেঁচেছিলেন তিনি সুরের স্বাধীনতায়। এর দুদিন পরই মারা গেলেন লাকী ভাই। মারা যাবার আগের দিন হাসপাতালে সন্ধ্যা বেলা শুয়ে শুয়ে বললেন. তানভীর একটা গান শোনাও তো। দেখি কেমন গান শিখেছো। লাকী ভাইয়ের সাথে সেই শেষ শব্দ বিনিময়। আমি ‘এই নীল মনিহার, এই স্বর্ণালী দিনে তোমায় দিয়ে গেলাম.. হাসপাতালের বেডে তখন লাকী ভাইয়ের চোখে এক উদাস কান্না। সেই শেষ দৃশ্য! ভালো থাকুন লাকী ভাই। ভালো থাকুন স্যার।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *