রাজধানী

সীমিত হয়ে আসছে ঢাকায় দাফনের জায়গা

পৃথিবীর সবচাইতে ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকায় দিন যতই যাচ্ছে মরদেহ দাফন বা সত্কারের জায়গা খুবই সীমিত হয়ে আসছে। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যুর পরও মরদেহ দাফনের জন্য একটুখানি জায়গা যে দরকার হয়, তা মাথায় রেখে সেভাবে কোনো পরিকল্পনাই করা হয়নি ঢাকা শহরে। ঢাকার জনসংখ্যা এখন দেড় কোটির ওপরে। সরকারি হিসেব মতেই সেটি ২০৩৫ সালে এসে দাঁড়াবে আড়াই কোটির বেশি। সামনে যে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে দাঁড়াবে, সেটি সম্ভবত বলাই যায়। তাই শুধু পরিকল্পনা গ্রহণ করে বসে থাকলে হবে না, সেটা শতভাগ বাস্তবায়ন করতে হবে। তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বেশিরভাগ কবরই এখন দুইবছর পর পর ভেঙে ফেলা হয়। যদিও ধর্মীয় পণ্ডিতদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষের ধর্ম ইসলাম কবরের ওপরে কবর দেওয়াকে স্বীকৃতি দেয়। আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে দেখা গেলো অসংখ্য কবর একটি আরেকটির গায়ে লাগানো। কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। বহু কবরের উপরে দেখা গেলো একের অধিক সাইন বোর্ড লাগানো। অর্থাত্ একের অধিক মানুষের জায়গা হয়েছে একেকটি কবরে। সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবার ও ভিন্ন এলাকার লোকদের ঠাঁই হয়েছে একই কবরে। ঢাকার যাত্রাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা সামিয়া সুলতানা বলছিলেন, হঠাত্ একদিন তিনি জানতে পারলেন, তার মায়ের কবরের ওপরে অন্য কাউকে কবর দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কথাটা শুনে খুবই আহত হই। আমি এভাবে আমার মায়ের শেষ চিহ্নটুকুও হারাবো, তা কখনো ভাবিনি। রাজধানীর জুরাইন কবরে স্থান পেয়েছিলো সামিয়ার বাবা, মা ও বড় ভাইয়ের মরদেহ। একইভাবে প্রতিটি কবর হারিয়েছেন তিনি। রাজধানী ঢাকায় ৮টি সরকারি কবরস্থান রয়েছে। আজিমপুরের কবরস্থানটিতে ৩০ হাজারের মতো আর বনানী কবরস্থানে রয়েছে ২২ হাজার কবরের জায়গা। ২০০৮ সাল থেকে দক্ষিণের জুরাইন ও আজিমপুরে এবং ২০১২ সাল থেকে ঢাকা উত্তরের ৬টি কবরস্থানে স্থায়ীভাবে আর কোনো কবরের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। ৫, ১০, ১৫ ও ২৫ বছর, এরকম নানা মেয়াদে সেখানে জায়গা বরাদ্দ আছে খুব অল্প কিছু কবরের। যার জন্য দেড় থেকে সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে হয়। কিন্তু যাদের এত টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই, তাদের জন্যই অস্থায়ী কবর। আর সেই সংখ্যাটিই বেশি। ঢাকা শহরে মরদেহ সত্কারের জায়গা সকল ধর্মের জন্যই খুব সীমিত হয়ে গেছে। ঢাকায় ভূমির অভাবে কবর নিয়ে সমস্যায় পড়েছে খ্রিস্টানদের সেমেটারিগুলোও। তেজগাঁওয়ে হোলী রোজারী চার্চে গিয়ে দেখা গেছে, সাদা ক্রশ চিহ্ন বসানো সারি সারি পাঁচশ’র মতো কবর। পাঁচ বছর পরপর একইভাবে পুরনো কবরে সমাহিত করা হয় নতুন মরদেহ। চার্চের প্রধান পুরোহিত ফাদার কমল কোরাইয়া বলছিলেন, খ্রিস্টান সমপ্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষ চার্চের সাথে সমাহিত হতে চান। সেখানে সবার স্থানসংকুলান আর সম্ভব হচ্ছে না। ঢাকায় খ্রিস্টানদের জন্যে আরো দুটি কবরস্থান রয়েছে ওয়ারী ও মোহাম্মদপুরে। সেখানেও একই অবস্থা। ঢাকার পোস্তগোলা ও কামরাঙ্গিরচরে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মরদেহ সত্কারের জন্য রয়েছে দুটি সরকারি শ্মশান। রাজারবাগে কালি মন্দিরে রয়েছে বেসরকারি একটি শ্মশান। খোঁজ নিয়ে জানা গেলো, দিনে দু’টির বেশি সত্কার এই শ্মশানগুলোতে হয় না। তাই বিষয়টি এখনো ঢাকার হিন্দুদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। সামনের কঠিন সময়ের জন্য কিভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে নগর কর্তৃপক্ষ, বিষয়টি জানতে চাইলে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল ইত্তেফাক’কে বলছিলেন, এত বড় শহরে এক কবরে একাধিকজনকে কবর দেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো অপশন নেই। আজিমপুরে নতুন কবরের জন্য জায়গা বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। ঢাকা উত্তরে অনেক নতুন কবরস্থান হচ্ছে, সেগুলো হলে স্থানসংকুলান সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, কেউ যদি মরদেহ নিজেদের জেলায় নিয়ে যেতে চায়, সে ব্যাপারে সিটি করপোরেশন সহযোগিতা দিচ্ছে। অ্যাম্বুলেন্স ভাড়াসহ আনুষঙ্গিক কিছু খরচও দেওয়া হয়। মূলত মরদেহ নিজ জেলায় নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে উত্সাহিত করতে এটি চালু করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *