লাইফস্টাইল

শীতে অন্ত্র ও মলদ্বারের সমস্যা ?

  শীত মৌসুমে বাজারে প্রচুর শাক-সবজি পাওয়া যায়। সে হিসেবে শীতে অন্ত্র ও মলদ্বারের সমস্যা না থাকারই কথা। কিন্তু শীত মৌসুমে সামাজিক নানান অনুষ্ঠান যেমন  বিয়ে, বৌভাত, বার্ষিক ভোজ, বনভোজন এসব অনুষ্ঠানও থাকে। যেখানে খাওয়া হয় প্রচুর মশলা, তেল-চর্বিযুক্ত গুরুপাক খাবার। ফলশ্রুতিতে দেখা দেয় অন্ত্র ও মলদ্বারের নানান সমস্যা। প্রায়শই যে সমস্ত সমস্যাগুলো দেখা দেয় সেগুলো হলো- ১.বদহজম ২. ডায়রিয়া ৩. ফুডপয়জনিং  ৪. কোষ্ঠকাঠিন্য ৫. এনাল ফিশার ; বৃদ্ধি পায় পাইলস বা অর্শ এবং আইবিএস এর সমস্যা।    ১.বদহজম/ইনডাইজেশন সামাজিক অনুষ্ঠানের মুখরোচক ও নয়নাভিরাম খাদ্যসামগ্রী সকলেরই রসনাবিলাসকে জাগ্রত করে । ফলশ্রুতিতে রসনানিবৃত্ত না হওয়া পর্যন্ত ভোজনবিলাসী  মাত্রই খাদ্য গ্রহণ করে থাকেন। এ সব খাদ্যের বেশিরভাগই থাকে অতিরিক্ত তেল-চর্বি-মশলাযুক্ত যা খাদ্যনালী দিয়ে পাকস্থলীতে প্রবেশ করা মাত্রই পরিপাকতন্ত্রকে উজ্জীবিত করে। হঠাৎ করে অতিরিক্ত পরিমাণ এবং তেল-চর্বি-মশলাযুক্ত গুরুপাক খাদ্য পাকস্থলীতে পৌঁছা মাত্রই হজম সহায়ক এসিড ও পাচকরসসমূহ উৎপাদন শুরু হয় বটে কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই তা গ্রহণকৃত সমুদয় খাদ্যের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ফলে বদহজম বা ইনডাইজেশন হয়ে থাকে । বদহজমের উপসর্গ সমূহ – পেট দম ধরে থাকা (Bloating) , তীব্র ঝাঁঝযুক্ত ঢেকুর ওঠা ,বমিভাব হওয়া , আংশিক পরিপাককৃত খাবার গলা বেয়ে ওঠে আসা ((Regurgitation)) অথবা বমি হওয়া। এসব উপসর্গ থেকে মুক্তি পেতে খাওয়া শেষ করে সঙ্গে সঙ্গেই  গাড়িতে ওঠা বা যাত্রা শুরু করা উচিৎ নয় । কিছুক্ষণ সোফা বা চেয়ারে সোজা হয়ে বসে থাকতে হবে। হজম কারক বা হজমী হিসেবে লেবু ও লবন পানি অথবা সোডা ওয়াটার অল্প অল্প করে পান করা যেতে পারে অত্যাধিক এসিডিটি হলে এন্টাসিড লিকুইড বা অম্লনাশক ওষুধ খাওয়া যেতে পারে। এসবে না কমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া আবশ্যক। অনেক সময় অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের পর হৃদযন্ত্রের সমস্যাও দেখা দেয়।   ২. ডায়রিয়া অতিরিক্ত তেল-চর্বি-মশলাযুক্ত খাবার এবং অতিভোজন ডায়রিয়ার একটি কারণ । খাবার স্যালাইন এবং ডায়রিয়া প্রতিষেধক ওষুধ ডায়রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। ডায়রিয়াজনিত কারণে প্রস্রাব কমে গেলে অতিসত্বর চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।   ৩. ফুড পয়জনিং একত্রে অনেক জনের জন্য রান্না করতে গেলে রান্নার আয়োজন করতে হয় অনেক আগে থেকেই। ফলে পচনশীল খাদ্য সামগ্রী খাবার অযোগ্য হয়ে পড়ে বা তাতে নানাবিধ জীবানুর সংক্রমণ ঘটে। সে কারণে এসব খাবার খেলে ফুড পয়জনিং হওয়া স্বাভাবিক। ফুড পয়জনিংয়ের আগে বমি এবং পরে ডায়রিয়া হয় । এক্ষেত্রে ডায়রিয়া প্রতিষেধক ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। অনিয়ন্ত্রিত ডায়রিয়া এবং বমির কারণে মৃত্যুও হতে পারে । তাই চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন বা শিরায় স্যালাইন নেয় উচিৎ। সেক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া বাঞ্ছনীয় । ফুড পয়জনিং এর রোগীকে বমি প্রতিষেধক বড়ি বা ইঞ্জেকশন দেয়া উচিৎ নয় । তাতে রোগীর ঘুম ঘুম ভাব আসে এবং খাবার স্যালাইন বা পানি পান না করার ফলে অতিরিক্ত পানিশূন্যতা ((Severe Dehydration) দেখা দেয় যা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।   ৪. কোষ্ঠকাঠিন্য অতিরিক্ত তেল-চর্বি-মশলাযুক্ত খাবার কোষ্ঠকাঠিন্যের অন্যতম কারণ। কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্তি পেতে এসব খাবার গ্রহণের পাশাপাশি সালাদ, সবজি, দই খাওয়া এবং প্রচুর পানি পান করা প্রয়োজন। কোষ্ঠকাঠিন্যের প্রতিরোধক হিসেবে অনেকেই ইসবগুলের ভূষি, গরম দুধ, তকমা খেয়ে থাকেন। গুরুপাক খাবারের পাশাপাশি এসব খাবারও বেশিমাত্রায় খাওয়া প্রয়োজন।   ৫. পাইল্স বা অর্শ অতিরিক্ত তেল-চর্বি-মশলাযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য হয় যা পাইল্স বা অর্শ রোগের উপসর্গ বৃদ্ধি করে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে ভুগতে থাকা রোগীদের পাইল্স থেকে রক্তক্ষরণ, বোঁট মলদ্বারের বাইরে চলে আসা এবং মলদ্বারে প্রদাহ হতে পারে। অনেকেরই এই রোগের উপসর্গ সর্বপ্রথম ধরা পড়ে গুরুপাক খাদ্য গ্রহণের ফলে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন বা ব্যবস্থা নেয়াই উত্তম।   ৬. এনাল ফিশার অতিরিক্ত তেল-চর্বি-মশলাযুক্ত গুরুপাক খাবার কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণ। ফলে মলত্যাগের সময় মলদ্বারে এনাল ফিশাররর সৃষ্টি হয়। এনাল ফিশারের একমাত্র কারণ কোষ্ঠকাঠিন্য। যাদের মলদ্বারে এনাল ফিশার বিদ্যমান তেল-চর্বি-মশলাযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে গুরুতর কোষ্ঠকাঠিন্য এনাল ফিশারের উপসর্গ বৃদ্ধি করে থাকে। ফলে মলদ্বার থেকে রক্তক্ষরণ এমনকি বিদ্যমান এনাল ফিশারের চতুরপার্শে পুঁজ জমে জটিল অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়াই সর্বোত্তম।   ৭.আই.বি.এস আইবিএস’র রোগীরা সচরাচর অনেক খাবারই পরিহার করে থাকেন কিন্তু বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় পরিজন-সহকর্মী- মুরব্বিদের ভাষায় ‘একবার খেলে আর কি হবে’ এ ধরনের অনুরোধে তেল-চর্বি-মশলাযুক্ত খাবার খেয়ে বিপদে পড়েন এবং অন্ত্রের নানাবিধ জটিলতার ভুগতে থাকেন। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ সেবন করা উচিৎ।   উপসংহার উন্নত বিশ্বের যে কোন আয়োজনে বানকোয়েট (Banquet) বা লাঞ্চ/ডিনারে নানান খাবার সাজিয়ে রাখে (A la Carte)। আবার তাদের সেট মেন্যুগুলোতেও থাকে পরিপাক সহায়ক সব ধরনের খাবারের সন্নিবেশ। যেমন-বিভিন্ন ধরনের সালাদ, সবজি, দই(টক/মিষ্টি), মাছ বা মাংশের সঙ্গেও থাকে টমেটো, শসা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সবজি বা সস। তা ছাড়া অতিরিক্ত তেল-চর্বি-মশলা তেমন একটা থাকে না । সব মিলিয়ে এসব খাবার সহজপাচ্য এবং বিভিন্ন ধরনের খাবার পরিবেশিত হয় বলে নিজের পছন্দ বা শরীরে সহনীয় খাবার গ্রহণের সুযোগ থাকে। অন্যদিকে আমাদের দেশের সামাজিক অনুষ্ঠান মানেই পোলাও-রোস্ট-বিরিয়ানী-কাবাব-টিক্কা ইত্যাদি গুরুপাক খাবার । তাই সুস্থ থাকতে পরিমিত আহার করুন, পছন্দের খাবার বুঝে শুনে খান। মলদ্বারকে স্বস্তি দিয়ে নিজে সুস্থ থাকুন ।   ডা. আহমেউজ জামান, সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সার্জারি বিভাগ। শহীদ তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজ, গাজীপুর। ই-মেইল : [email protected]  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *