বাংলাদেশ

রক্তস্নাত মিরপুর এবং ন্যায় ও সত্যপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম

ঢাকা মহানগরীতে মিরপুরের বিশেষ অবস্থান সম্পর্কে আলোকপাত করে একাত্তরে এই অঞ্চল জুড়ে সংগঠিত নৃশংসতার মাত্রা ও চরিত্র বুঝে নেয়ার প্রয়াস এই নিবন্ধে গ্রহণ করা হয়েছে। দেখার চেষ্টা নেয়া হয়েছে, একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের যে প্রক্রিয়া প্রায় চার দশকের অস্বীকৃতি ও অপমান মোচন করে আজ সূচিত হয়েছে সেই ঐতিহাসিক পর্বান্তরে মিরপুরের ইতিহাস ও অবস্থান কোন ভূমিকা পালন করতে পারে। বলা বাহুল্য, আলোচ্য বিষয়ের রয়েছে বিশাল ব্যাপকতা, সেই গভীরে প্রবেশের যোগ্যতা আলোচকের নেই, মাঠপর্যায়ের কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এখানে কেবল কিছু মোদ্দা কথা বলবার চেষ্টা নেয়া হবে।   মিরপুরের বেনারসি পল্লীর পেছনে ঝুটপট্টিসংলগ্ন জল্লাদখানা বধ্যভূমি খনন ও শহীদের অস্থি-করোটি পুনরুদ্ধারের কাজ করেছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে এবং পরে ২০০৭ সালে এখানে ক্রিয়াশীলভাবে নির্মিত হয় বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ। এই স্মৃতিপীঠ তার নকশা ও বিন্যাসে অতীত ঘটনাকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে চেয়েছে যেন তা স্থানীয় এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করতে পারে। কোনো দর্শনার্থী যখন স্মৃতিপীঠের ত্রিকোণ-ভূমি পরিভ্রমণ করে সেই নির্মম হত্যাস্থানের সামনে এসে দাঁড়াবেন, পরিত্যক্ত পাম্প হাউজের যে জলাধারে হত্যার পর লাশ ফেলে দেয়া হয়েছিল, ইতিহাসের নিষ্ঠুরতার সেই স্থানটিতে পৌঁছাবার আগে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলার বধ্যভূমির পরিচিতি এবং বিশ শতকের বিভিন্ন গণহত্যার বাস্তবতার চকিত উদ্ভাসন ঘটবে পরিভ্রমণকারীর সামনে। সেই বৃহত্তর পটভূমিকা পেছনে ফেলে দর্শনার্থী এসে দাঁড়াবেন একাত্তরের বাস্তব হত্যাভূমিতে, অগণিত শহীদের সামান্য ক’জনার নাম-পরিচয় কিংবা হত্যাকালে তাঁদের পরিধেয় কোনো ময়লা গেঞ্জি অথবা পায়ের ফিতে-ছেঁড়া স্যান্ডেল অথবা পকেটে রাখা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের শিশি তিনি দেখতে পাবেন স্বল্পপরিসর প্রদর্শনীতে, খননের সময় হাড়গোড়ের সঙ্গে মিশে থাকা যেসব সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছিল। গণহত্যার বিশাল বাস্তবতার বিবৃতিমূলক অবস্থান পেরিয়ে যখন কেউ এসে মুখোমুখি হন সেই ব্যক্তিগত পরিচিতির তখন ইতিহাস ও সভ্যতার সত্য মানবিক মাত্রায় উপলব্ধির সুযোগ তিনি পান এবং বুকের গভীরে অনুভব করতে পারেন ভিন্নতর আলোড়ন। নিশ্চিতভাবে তাঁর মনে জাগবে অনেক জিজ্ঞাসা এবং জবাব খোঁজার সুবাদে তিনি ক্রমান্বয়ে পেতে পারেন ইতিহাসের সত্য-পরিচয় যা তাঁকেই অনুসন্ধান করে ফিরতে হবে।   এখানে দুটি অভিজ্ঞতার উল্লেখ না করলেই নয়। ১৯৯৯ সালে জল্লাদখানা বধ্যভূমি খননের অব্যবহিত পূর্বে মিরপুরবাসীর আমন্ত্রণে মুসলিম বাজার বধ্যভূমিতে কাজ করেছিল মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। মুসলিম বাজার মসজিদ সম্প্রসারণের সময় এই বধ্যভূমির অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয় এবং খননের মাধ্যমে এখান থেকেও অনেক অস্থিখণ্ড ও করোটি উদ্ধার করা হয়, যা এখন সংরক্ষিত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। পরবর্তী সময়ে বধ্যভূমিক্ষেত্র আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা যায়নি, মসজিদের সম্প্রসারণ কাজ পরিচালিত হয়ে তা আবৃত করে ফেলেছে বধ্যভূমি। তবে মসজিদ কমিটি আরেকভাবে স্মৃতিসংরক্ষণের কাজে ভূমিকা পালন করেছেন। নতুনভাবে প্রসারিত মসজিদের যে স্তম্ভগুলো বধ্যভূমির ওপর নির্মিত হয়েছে তা কালো রং করে রাখা হয়েছে। অনেকগুলো সাদা স্তম্ভের মাঝে গুটিকয় কৃষ্ণস্তম্ভ নামাজিদের কাছে ইতিহাসের ভিন্নতর এক বাস্তবতা মেলে ধরছে। যাঁরা পূর্বাপর ইতিহাস জানেন না, তাঁদের কাছে এ এক প্রশ্ন মেলে ধরেছে, যে-প্রশ্নের জবাব খোঁজার সূত্রে তাঁরা পেতে পারেন ইতিহাসের সত্য-পরিচয়।   মুসলিম বাজার ও জল্লাদখানা বধ্যভূমি খননের পরপর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আমন্ত্রণে ঢাকা এসেছিলেন ফিজিসিয়ান্স ফর হিউম্যান রাইটসের পরিচালক মার্কিন ফরেনসিক অ্যানথ্রোপলজিস্ট ডা. উইলিয়াম হাগল্যান্ড। তিনি খনন-ফলাফল সরেজমিন প্রত্যক্ষ করে স্রেব্রেনিকায় ১৯৯৫-৯৬ সালে বধ্যভূমি খননে তাঁদের কাজের অভিজ্ঞতা মেলে ধরেন। তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বধ্যভূমি খননে রয়েছে বিশেষ পদ্ধতিগত দিক এবং যথাযথ ব্যবস্থা ও বিধি-মোতাবেক খনন পরিচালিত না হলে অনেক ধরনের ফরেনসিক তথ্য বিনষ্ট হতে পারে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিল গণহত্যার তথ্য-প্রমাণ উদ্ঘাটন ও আহরণের কাজে পেশাদারি দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনা বিশেষ জরুরি, যা গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বর্তমান বিচারকার্যের ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে প্রযোজ্য।   দুই.   জল্লাদখানা বধ্যভূমি স্মৃতিপীঠ ঘিরে মিরপুরবাসী এবং বিশেষভাবে মিরপুরের সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ও তরুণসমাজ নতুনভাবে সংগঠিত হচ্ছে। এই স্মৃতিপীঠ হয়ে উঠছে স্মৃতির নবায়নের নানামুখি কর্মকাণ্ডের ভিত্তি। মিরপুরের ইতিহাস সম্পর্কে কিছু কথা এখানে বলা যেতে পারে।   মিরপুর ঢাকার অদূরের এক প্রাচীন ভূমি, সংযোগ-নদী ঘেরা মিরপুর নৌপথে সহজে পৌঁছানো-সম্ভব স্থল। তদুপরি এখানে ছিল ঢেউ-খেলানো টিলা-সদৃশ ভূমি, যা বন্যাজলের প্রকোপ থেকে মুক্ত। ফলে মিরপুরে বসতি বেশ প্রাচীন, যদিও তা কোনো বিশাল জনপদ ছিল না। মিরপুরের সেই প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য এখন আর নেই, সব কেটে-পিষে সমতল করে নেয়া হয়েছে উন্নয়নের বুলডোজার চালিয়ে। পুরনো প্রকৃতির স্মৃতি বহন করছে ‘সেনপাড়া পর্বতা’ নামটি, আর এর একমাত্র পরিচয় হয়ে রয়েছে টিলার ওপরের মাজার। বছর কয়েক আগে দিল্লি থেকে আগত এক লেখিকা আমাকে বলেছিলেন তাঁর ঠাকুরমার কথা, যিনি কখনো ভুলতে পারেননি বাল্যকালের স্মৃতি। লেখিকার অবশ্য এমন কোনো স্মৃতি বা পিছুটান নেই, কোথায় ছিল ঠাকুরমার গ্রাম সেসবের কিছুই জানেন না। বিচ্ছিন্নভাবে মনে করতে পারেন পিতামহীর বাস ছিল ঢাকার অদূরে এক গ্রামে, সেই গ্রামের নাম মিরপুর এবং তাদের বাড়িতে ছিল এক পাঠশালা, আর বাড়ির নাম ছিল সিদ্ধান্তবাড়ি। এটুকু তথ্য থেকে বুঝে নিতে অসুবিধা হয় না সেই গ্রাম এখন ঢাকার করতলগত এবং আদিবাড়ির কোনো চিহ্ন না থাকলেও মিরপুর সিদ্ধান্ত উচ্চবিদ্যালয় উত্খাত হয়ে যাওয়া এক পারিবারিক জীবনের দাগ বহন করছে, জন্মদাগের মতো যা কখনো মুছে যাওয়ার নয়।   উত্খাতের পাশাপাশি নতুন বসতি গড়াও শুরু হয়েছিল নগরায়ণের চাপে। উন্মুক্ত উদার মিরপুর এ-কাজে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। দেশভাগের পর, বিশেষত ষাটের দশকের শুরু থেকে, মিরপুর হয়ে ওঠে পাকিস্তানি শাসকদের নতুন তরিকার দেশ গড়বার বড় ভিত্তি। মিরপুর ও মোহাম্মদপুর জুড়ে গড়ে তোলা হয় রিফিউজি টাউনশিপ, যে ধরনের বসতি পাঞ্জাব পার্টিশনের ভিকটিমদের জন্য পশ্চিম পাকিস্তান ও পশ্চিম ভারতে অনেক গড়ে উঠেছিল। মিরপুর মোহাম্মদপুরে সরকারি উদ্যোগে যে কলোনি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেখানে পাকিস্তানি শাসকদের বাঙালি-বিদ্বেষ নীতির চরম প্রকাশ ঘটিয়ে অবাঙালি মোহাজেরদের দেয়া হয় অগ্রাধিকার। উদ্দেশ্য ছিল এভাবে ঢাকা শহরে একটি বিশাল তাবেদার গোষ্ঠী তৈরি করা, যারা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মদদদাতা হিসেব কাজ করবে। এই দুই এলাকায় যেসব প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল তার তথ্য-উপাত্ত আমাদের হাতের কাছে নেই, কিন্তু বাস্তবতার পরিচয় তো সেকালে সর্বভাবে প্রতিফলিত হয়েছিল। ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে, বিশেষভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ৬-দফা দাবিনামা ঘোষণার পর থেকে যে প্রতিরোধ আন্দোলন পূর্ববাংলায় জেগে উঠতে থাকে, ঊনসত্তরে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির লক্ষ্যে যে আন্দোলন হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য, তা সংগঠিত করা সহজ ছিল না এবং মিরপুর-মোহাম্মদপুরে সেটা ছিল আরো অনেক দুরূহ ও কষ্টসাধ্য। কেননা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী করুণার প্রসাদ বিতরণ করে নিম্নবর্গীয় অবাঙালি মুসলিম মোহাজেরদের ভেতর থেকে একটি বিশাল অনুগতগোষ্ঠী তৈরি করে চলছিল। আর আমরা জানি, সবচেয়ে যারা ভাগ্যাহত, জমি-জমা ভিটেমাটি সবকিছু থেকে উচ্ছেদ হয়ে সহায়-সম্বলহীনভাবে স্বদেশ-বিতাড়িত সেসব উদ্বাস্তু নতুন জীবন গড়ে তুলতে চাইছে, তাদের মধ্যে থাকে লুম্পেন প্রলেতারিয়েত, যারা পথভ্রষ্ট হয়ে নিজ শ্রেণির স্বার্থের বিরুদ্ধে শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে অবস্থান নিতে দ্বিধা করে না এবং সমাজের ও মানুষের মুক্তির বিপরীতে এরা হয়ে ওঠে মরীয়া এক গোষ্ঠী। মিরপুরে এমনি এক সমর্থক সম্প্রদায় গড়ে তুলতে চেয়েছিল পাকিস্তানি সামরিক শাসক আইয়ুব খান, আর এর স্বীকৃতিস্বরূপ মোহাম্মদপুরে প্রবেশের মুখে নির্মিত হয়েছিল দ্বার, নাম দেয়া হয়েছিল আইয়ুব গেট। পাশাপাশি মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন সড়কের নাম রাখা হয়েছিল মোগল বাদশাহদের নাম-অনুসরণে, এমনকি শের শাহের সেখানে স্থান হয়েছিল, কেবল মহান এক মোগল সম্রাট এই পাকিস্তানি ‘সম্মান’ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন, তিনি ছিলেন আকবর, সমন্বয়ের ও সহনশীলতার সংস্কৃতি তুলে ধরে যিনি উপমহাদেশের ইতিহাসে সদা কীর্তিত হয়ে আছেন। বাদশা আকবর যে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কাছে পরিত্যাজ্য বিবেচিত হবেন সেটা স্বাভাবিক, কেননা যে-ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষমূলক ঘৃণার আদর্শ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অবলম্বন সেখানে আকবরের উপস্থিতি তাদের কাছে কেবল অনভিপ্রেত নয়, তাদের জন্য ভীতিপ্রদও বটে।   মিরপুর-মোহাম্মদপুর তাই ঢাকার বুকে ভিন্নতর এক চারিত্র নিয়ে বিকশিত হচ্ছিল। গণতন্ত্র ও জাতীয় অধিকারের আন্দোলনকারীদের কাছে বিশেষ বিবেচ্য হয়ে উঠেছিল মিরপুর-মোহাম্মদপুর এলাকা। শাসকগোষ্ঠী এই এলাকায় নানা ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে চলছিল, এর বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হয়েছে প্রতিরোধ আন্দোলনকারীদের। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় মিরপুরের অবাঙালি অধিবাসীদের ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক সংঘাত সৃষ্টির চেষ্টা নেয়া হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এখানে পথসভা ও মিছিল করে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বাঙালি-অবাঙালি সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হলে কবি সুফিয়া কামালসহ নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা তা প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন, কেননা সেটা ঘটলে গণ-আন্দোলনের জন্য হয়ে উঠত ক্ষতিকর।   আবার মিরপুর-মোহাম্মদপুরের অবাঙালি অধিবাসীদের কারো কারো মধ্যেও পড়ছিল আন্দোলনের অভিঘাত। তাঁদের মধ্য থেকেও আন্দোলনের কাতারে এসে যোগ দিচ্ছিলেন কেউ কেউ, সংখ্যায় কম হলেও এই প্রবণতার ছিল বিশেষ তাত্পর্য। আমার মনে পড়ে মিরপুরের নবীন যুবার একটি গোষ্ঠী বিশাল ছাত্র-গণমিছিলে যোগ দিয়ে শ্লোগান ধরত উর্দুতে, যোগ করতো মিছিলে নতুন মাত্রা। তাঁদের এক উচ্চকণ্ঠ শ্লোগান আজো কানে অনুরণন তোলে, ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়। সাচ আজাদি ছিন লো, রুটি-কাপড়া সব কো দো।’   কিন্তু গণতন্ত্রের পথে তো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এগোতে পারেনি, ফলে গণতন্ত্রের শক্তি বিকাশের সুযোগ পেল না, লুম্পেনরাই হয় উঠল নিয়ন্তা, সেটা যেমন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়েছিল, তেমনি ঘটছিল মিরপুরের অবাঙালি অধিবাসীদের ক্ষেত্রেও। এই লুম্পেনদের একাংশ ছিল বাস্তব সহায়-সম্পদহীন হিসেবে লুম্পেন, আরেক অংশ ছিল আদর্শগত ও মানবিক মূল্যবোধহীন লুম্পেন, দ্বিজাতিতত্ত্বের ঘৃণাবোধ দ্বারা আচ্ছাদিত মানুষ, এদের দ্বারাই সংঘটিত হয়েছিল বিশ শতকের নৃশংসতম এক গণহত্যা, বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়েছিল যথেচ্ছ হত্যাভিযান, কেবল বাঙালি হওয়ার অপরাধে খুুনের শিকার হয়েছিলেন অগণিত মানুষ।   তিন.   বাংলাদেশে একাত্তরে সংঘটিত গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি দীর্ঘকাল নীরবে নিভৃতে কেঁদে ফিরেছিল। ১৯৭৩ সালে নবগঠিত জাতীয় সংসদে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল অ্যাক্ট শীর্ষক অমন তাত্পর্যময় আইন প্রণয়ন সত্ত্বেও অপরাধীদের বিচার বাংলাদেশ করে উঠতে পারেনি। এই দায় যেমন বাংলাদেশের তেমনি বিশ্বসম্প্রদায়ের। অধিকন্তু, ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যার পর যুদ্ধাপরাধীরা রাষ্ট্রক্ষমতার অংশী হয়ে ওঠে। বাতিল হয় দালাল আইন, বন্ধ হয় বিচারপ্রক্রিয়া এবং যুদ্ধাপরাধীরা কার্যত অর্জন করে অব্যাহতি বা ইমপিউনিটি। দীর্ঘকাল চরম প্রতিকূল পরিবেশে চললেও বিচারের দাবি কখনো মুছে যায়নি জনচিত্ত থেকে এবং স্মৃতিসংরক্ষণ প্রয়াসে সমাজের নানামুখি প্রচেষ্টা এই দাবিকে জোরদার করে তুলতে থাকে। এখানে বিশেষভাবে স্মরণীয় শহীদ জননী জাহানারা ইমাম পরিচালিত নৈতিক আন্দোলন অথবা সাম্প্রতিক কালে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম পরিচালিত সামাজিক আন্দোলন। আরো কতভাবেই না মানুষ করেছে এই কাজ—স্মৃতিভাষ্য লিখে, গল্প-কবিতা রচনা করে, চলচ্চিত্র-নাটক-চিত্রাঙ্কণ ইত্যাদি বিভিন্ন শিল্পিত সৃজন প্রয়াসে পরিপুষ্টি পেয়েছে এই দাবি। পরিবারের ভেতরেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়েছে অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বাহিত হয়েছে। শহীদ পরিবারও পালন করেছে তাত্পর্যময় ভূমিকা। এসব প্রয়াসের সম্মিলিত প্রতিফলন ঘটেছে বিগত ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে যখন দেশবাসী এবং বিশেষ করে প্রথমবারের মতো ভোটাধিকারপ্রাপ্ত নবীন প্রজন্মের সদস্যরা বিপুলভাবে রায় দিয়েছে গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের বিচারের পক্ষে।   এক্ষণে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়েছে ট্রাইবুন্যাল, নিয়োগ দেয়া হয়েছে তদন্তকারী ও আইনজীবীদের, প্রধান পাঁচ অভিযুক্তকে তোলা হয়েছে কাঠগড়ায়, চলছে অভিযোগপত্র প্রণয়নের কাজ। যে বিচার ঘটবে আদালতে তা গণহত্যার সামগ্রিকতার চুম্বকাকার উপস্থাপন ঘটালেও সমগ্রপরিচয় সেখানে মিলবে না। গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে দেশব্যাপী, পুরো নয় মাস জুড়ে, আর মিরপুরের ক্ষেত্রে তা আরো প্রলম্বিত হয়েছিল। এই বিশাল মাত্রার নৃশংসতার ধরন, পদ্ধতি, তার জন্য দায়ী নেতৃবর্গ, তাদের দোসর, সহযোগী ও উস্কানিদাতা, নির্মমতার শিকার মানুষজনের অবস্থান ইত্যাদি বিষয় আদালতের কার্যক্রমে ফুটে উঠলেও তা প্রতিটি জনপদের দুর্ভাগা মানুষদের প্রতিজন অথবা প্রতি পরিবারকে তো অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে না। তদুপরি গণহত্যার সামগ্রিকতার রূপরেখা উপস্থাপনের পর অভিযোগ তো নির্দিষ্টভাবে প্রযুক্ত হবে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো বিশেষ কতক ব্যক্তিকে ঘিরে, তথ্য-প্রমাণ, সাক্ষী-সাবুদ আবর্তিত হবে সেইসব অভিযুক্তকে কেন্দ্র করে। সেক্ষেত্রে এর বাইরে থাকা হাজারো লাখো অপরাধের ও নির্মমতার ক্ষেত্রে কী হবে? রক্তস্নাত মিরপুরে সংঘটিত মানবতা-বিরোধী অপরাধের ব্যাপকতা ও নৃশংসতার ফরিয়াদ মিলবে কোথায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *