সংস্কৃতি

মেলায় মাদুর বিছিয়ে বই বিক্রি করতাম


  এবারের বইমেলা খুব সুন্দর। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বড় বড় প্যাভিলিয়ন। ফোয়ারা, শিশু চত্বর, বড় ইট বিছানো পরিসর। কী যে ভালো লাগে!   আমি প্রথম বইমেলায় আসি ১৯৮৪ সালে। তখন বুয়েটে পড়ি। বন্ধুরা মিলে দল বেঁধে আসতাম। সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমানের বই কিনতাম। বাংলা একাডেমির পুকুরপাড়েও স্টল ছিল। একবার একটা স্টলে লেখা হলো, এখানে নির্মলেন্দু গুণকে পাওয়া যায়। তখন একজন মন্তব্য করল, ‘ডজন কত করে?’ গুণদা ওই সময় একটা কলাম লিখেছিলেন, বয়স্ক পাঠকেরা গেলেন কোথায়? কারণ বই যারা কেনে, সবাই তরুণ। বয়স্ক মানুষকে বই কিনতে দেখা যায় না।   বর্ধমান হাউজের পেছনে যেখানে লিটল ম্যাগাজিনের চত্বর বসে, সেখানে থাকত খাবারের দোকান। কবি মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ আড্ডা দিতেন। আমিও তরুণ কবি, তাদের পাশে বসে আছি। এলেন শামসুর রাহমান আর হুমায়ূন আহমেদ। আমি তাদের পাশে বসে আছি। কবি ফেরদৌস নাহার এসে বললেন, ‘আনিস যে একেবারে বড়দের দলে যোগ দিয়েছ।’   মেলায় আসতেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই, সমুদ্রগুপ্ত, কাইয়ুম চৌধুরী, বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, সৈয়দ শামসুল হক, শামসুর রাহমান, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, খোন্দকার আশরাফ হোসেন, ফয়েজ আহমদ- এরা আর আসবেন না। কিন্তু তাদের বই তো আছে। বইয়ের মাধ্যমেই আমরা তাদের পেতে পারি।   আমার ‘ও বন্ধু কাজলভোমরা’ বইটা সৈয়দ শামসুল হককে উত্সর্গ করেছি। কারণ তিনি বলেছিলেন, আমি রংপুরের ভাষায় সংলাপ লেখা শুরু করেছিলাম, একজন বললেন, তুমি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছ। আমার এ বইটা রংপুরের পটভূমিতে লেখা।   আরেকটা উপন্যাস লিখেছি বঙ্গবন্ধু এবং ৫০-৬০ দশক নিয়ে। নাম আলো-আঁধারের যাত্রী। এটা উত্সর্গ করেছি আসাদুজ্জামান নূরকে। কারণ তিনি প্রায়ই জিগ্যেস করতেন, ‘যারা ভোর এনেছিল ও উষার দুয়ারে বই দুটোর পরের পর্ব কই?’ এটাই সেটা।   হুমায়ুন আজাদ ছিলেন বইমেলার সবচেয়ে নিয়মিত লেখক। আমি নিজে কিন্তু অনেকদিন ভোরের কাগজের জন্য বইমেলার প্রতিদিনকার প্রতিবেদন লিখেছি। তাকে নিয়ে অনেক মজার স্মৃতি আছে। প্রথমবার যখন তিনি নারী বইটা বের করলেন, প্রচ্ছদ ছিল না, তাও বিক্রি হতে লাগল, আমাকে বললেন, ‘নারী তো প্রচ্ছদ ছাড়াই ভালো।’ আমি এটা কাগজে লিখে দিয়েছিলাম, তিনি আমার ওপরে রাগ করেছিলেন।   আমার সঙ্গে মুহম্মদ জাফর ইকবালের পরিচয় হয়েছিল বইমেলাতেই। আহসান হাবীবের কাছে জাফর ইকবাল স্যার জিগ্যেস করেছিলেন, ‘নতুনদের মধ্যে ভালো কারা লেখে?’ আহসান হাবীব ভাই তখন দিনরাত্রি প্রকাশনা চালাতেন, বলে দিলেন, ‘এই যে আনিসুল হক, নতুন কিন্তু ভালো লেখে।’   আমার প্রথম কবিতার বই বেরিয়েছিল ১৯৮৯ সালে। আমি তখন বুয়েটের ছাত্র। বইমেলার ভেতরে মাদুর বিছিয়ে বই বিক্রি করতাম। পরে একটা টেবিল জোগাড় করে টেবিলে রেখে বই বিক্রি করতে শুরু করলাম। ২০ টাকা দাম ছিল। ১৫% কমিশনে ১৭ টাকা পেতাম প্রতি বইয়ে। ৫০০ কপি সব বিক্রি হয়ে গেল। ওই কবিতাটাও ওই বইয়েই ছিল:‘তুই কি আমার দুঃখ হবি/এই আমি এক আউলা বাউল/রুখো চুলে পথের ধুলো/সেইখানে তুই রাতবিরেতে স্পর্শ দিবি…।’   ২৮ বছর ধরে আমি নতুন বই নিয়ে বইমেলায় যাই। বইমেলা নিয়ে আমার একটা কবিতা আছে:‘মেলা ভেঙে যাবে যথারীতি আটাশেই/বিকেলগুলোকে বড় মনে হবে খুব/ঝরা পাতা রঙা চায়ের পেয়ালা দেখে/মনে পড়ে যাবে খয়েরি দীর্ঘ জামা/পেয়ালার পরে পেয়ালা ওড়াব ফুঁয়ে/একজোড়া চোখ তৃষ্ণা বাড়াবে তবু।’   একবার বইমেলায় এক দীর্ঘাঙ্গিনীকে দেখে তার সন্ধানে সারা মেলা হেঁটে নিজের প্রকাশকের কাছে এসে শুনলাম, একটা লম্বা মেয়ে আমার খোঁজে এসে অনেক দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেছে। মেয়েটার নাম ছিল নন্দিতা। তাকে আমি আর কোনোদিনও খুঁজে পাইনি।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *