ফিচার্ড পোস্ট

মাদকের টাকা যায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়েও

ইয়াবাসহ মাদকের ব্যবসা করতে হলে প্রশাসনকে উেকাচ দিতেই হবে। তবে এই উেকাচের পরিমাণ যে মাসে কোটি কোটি টাকা তা অনেকের জানা ছিল না।  স্থানীয় প্রশাসন, রেঞ্জ, জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় ও গোয়েন্দা বিভাগের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার নিয়মিত উেকাচ গ্রহণের ফলেই দেশব্যাপী মাদকের দ্রুত বিস্তার ঘটেছে। মাসে কোটি কোটি টাকার উেকাচ তাদেরসহ এক শ্রেণীর স্থানীয় রাজনীতিকদের পকেটে যায়। কোন কোন রাজনীতিকদের নির্বাচনী ব্যয়ভার ও মাস্তান নিয়োগের কাজটিও করেন মাদক ব্যবসায়ীরা। মাদক নির্মুল অভিযানে গুলি বিনিময়কালে নিহত দুই মাদক সম্রাটের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এ ধরনের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এদিকে আট জেলায় মাদক নির্মুল অভিযানে গুলি বিনিময়কালে আরো ৭ শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। এ নিয়ে গত ৪ মে থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যার দাঁড়ালো ৪৩ জন।   জানা গেছে, সারাদেশে দ্রুত মাদকের বিস্তারের মূলে স্থানীয় প্রশাসন, রেঞ্জ, জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় ও গোয়েন্দা বিভাগ এবং মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক শ্রেণীর কর্মকর্তারা নিয়মিত উেকাচ গ্রহণকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের পারিবারিক অনুষ্ঠান, বিদেশ ভ্রমণ ও স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সব ব্যয়ভার বহন করে থাকে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা, যারা মাদকের গডফাদার হিসেবে পরিচিত। ইতিমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর মাদক ব্যবসায় সহযোগিতাকারী স্থানীয় প্রশাসন, রেঞ্জ, জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় ও গোয়েন্দা বিভাগের কর্মকর্তাদের তালিকা করা হয়েছে। সরকারের হাইকমান্ডের নির্দেশনায় সারাদেশে মাদক নির্মুলের অভিযান পরিচালনাকালে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের হয়ে আসছে। অধিকাংশ জেলায় স্থানীয় প্রশাসন, রেঞ্জ, জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয় ও গোয়েন্দা পুলিশ বিভাগে নতুন কোন কর্মকর্তা যোগদান করলে প্রথমে তাকে এক কোটি থেকে ৫০ লাখ, নিম্নে ১০ টাকা পর্যন্ত দিয়ে থাকে মাদক ব্যবসায়ীরা। এদিকে পুলিশের ত্রৈমাসিক অপরাধ বিষয়ক সভায় পুলিশ সুপার পদ মর্যাদার একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সদস্য ও কর্মকর্তারা জড়িত। দেশের বিভিন্ন থানায় ওসি, এসআই, এএসআই পদায়নে রেঞ্জ ডিআইজিরা ২০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণ করেন। মাঠ পর্যায়ের এসব কর্মকর্তারা ঘুষের এই টাকা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আদায় করে করে থাকেন।   চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার উপজেলা জেলার দক্ষিণ রূপকানিয়া আলামিনপাড়ার মৃত আব্দুল করিমের পুত্র মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু মাদক গডফাদার হিসেবে পরিচিত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী। সম্প্রতি মাদক নির্মুল অভিযানে গুলি বিনিময়কালে মঞ্জুরুল আলম মঞ্জু ফেনী এলাকায় নিহত হয়। চট্টগ্রামের রিয়াজউদ্দিন মার্কেট, পোস্ট অফিস গলিতে তার দোকান ছিল। তার চার ভাই। রিয়াজউদ্দিন মার্কেট ও জহুর হকার মার্কেটে তাদের কাপড়ের ব্যবসা। সে দোকান দিয়ে কোনভাবে চলতো। এক যুগ ধরে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যবসায় সে ধীরে ধীরে টেকনাফ এবং মিয়ানমার থেকে শুরু করে সারাদেশে মাদকের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। ২০১৫ সালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় ৫ লাখ ২৬ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয় মঞ্জু। ২০১২ সালে একবার চট্টগ্রামে মাদকের বড় চালান এবং ২০১৪ সালে ১৭ হাজার ইয়াবাসহ চট্টগ্রামে গ্রেফতার হন তিনি। স্থানীয় প্রতিনিধি ও আত্মীয়-স্বজনরা জানান, তার সাথে পুলিশের সখ্যতা ছিল। অনেক পুলিশ তার টাকায় বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন। গ্রেফতার হওয়ার কয়েকদিন আগে তার কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা নিয়েছেন এক কর্মকর্তা। মঞ্জুর বিরুদ্ধে মাদকের ১২টিরও অধিক মামলা রয়েছে।   এদিকে আরেক মাদক সম্রাট হলেন বাচ্চু খান। সে টঙ্গীতে এক সময় একটু খাবারের অপেক্ষায় থাকতো এবং চলন্ত ট্রাক থেকে কাচা তরকারী চুরি করে খাবার যোগাড় করাই ছিলো যার প্রধান পেশা। গত ৩ দিন আগেও যাকে টঙ্গী এলাকাজুড়ে মাদক সম্রাট বলে পরিচিত ছিলো সেই বাচ্চু র্যাবের সাথে গুলি বিনিময়কালে নিহত হয়। শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতি থানার বাইলকা গ্রামের মৃত আশরাফ খানের ছেলে বাচ্চু খান। এরশাদ সরকারের আন্দোলনের সময় মা ফুলেচা বেগমের হাত ধরে টঙ্গীতে আসে বাচ্চু। সে সময় মাজার বস্তিতে তার মায়ের থাকার স্থান হলেও বাচ্চু চলে যায় ফুটপাতে। টানা ৪ বছর টঙ্গী বাসষ্ট্যান্ডে অবস্থিত মায়া হোটেলের সামনের ফুটপাতে জায়গা করে নেয়। সেখানে থেকে রাতের বেলায় ঢাকা- ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে চলাচলরত মালবাহী চলন্ত ট্রাক থেকে কাচা তরিতরকারী চুরি করে বাজার এলাকায় বিক্রি করে জীবন চলত। দুই বছরের মাথায় পরিচয় হয় বিএনপির এক নেতার সাথে। ওই নেতা বাচ্চুকে নিয়ে মাজার বস্তিতে হেরোইন বিক্রি ও বিএনপির রাজনীতি করার জন্য সক্রিয় করে তোলে। এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি বাচ্চুর। ধিরে ধিরে বস্তি এলাকায় নাম করা মাদক বিক্রেতা হিসাবে পরিচিত লাভ করে, বস্তি এলাকায় সবার থেকে পারদর্শী মাদক বিক্রি করায় এলাকার ওই সময়ের মাদক সম্রাট মোল্লা, বাচ্চুকে বিএনপি নেতার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়। বেশ কিছুদিন পর বিএনপি সরকারের শেষের দিকে যৌথবাহীনির অভিযানে মোল্লা গ্রেফতার হয়। সে সময় মোল্লার মাদক সম্রাজ্য দেখাশোনার দায়িত্ব চলে আসে বাচ্চুর কাছে। ধিরে ধিরে বাচ্চু হয়ে উঠে মাজার বস্তির মাদক পল্লির সম্রাট। বাচ্চু এলাকায় ঘোষনা দেয় সে আর খুচরা মাদক বিক্রি করবে না। এই বস্তিতে কেউ মাদক বিক্রি করলে তার কাছে থেকে পাইকারী ক্রয় করে বিক্রি করতে হবে। শুরু হয় বাচ্চুর সম্রাজ্য জীবন। ৬ মাস পর জামিনে মুক্ত পায় মোল্লা। মুক্তির ২ মাসের মাথায় বিভিন্ন রোগে মোল্লা মারা যায়। এককভাবে পুরো মাজার বস্তির মাদক পল্লি নিয়ন্ত্রনে চলে আসে বাচ্চুর হাতে। স্থানীয় প্রশাসন, রাজনৈতিক ব্যক্তি সবই তখন বাচ্চুর ইসারায় চলে আসে। পৌর নির্বাচন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সমস্ত অনুষ্ঠানে থাকে বাচ্চুর বিশাল অংকের অনুদান। বাচ্চু হয়ে উঠে রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন স্থানী মাস্তানও প্রভাশালীদের আস্তাভাজন। এভাবে চলতে থাকে ১৯৯৫ সাল থেকে গত ২১ মে অর্থাত্ ২৩ বছর পর্যন্ত। এর মধ্যেই বাচ্চু ৩টি বিবাহ করেন, (১) রিনা (২) বেদে সম্প্রদায় সোনিয়া (৩) ও তার আশ্রয়দাতা বিএনপি নেতার ভাতিজী রোজিনাকে।   বাচ্চু প্রশাসনে প্রতি সপ্তাহে এক থেকে দেড় কোটি টাকা ঘুষ দিতে হতো বলে জানিয়েছেন মাজার বস্তির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাদকের সেলসম্যানরা। তারা আরো বলেন, গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা ৫/৬ মাস আগে বস্তি থেকে বাচ্চুকে আটক করে নিয়ে যায়। এরপর দিন সকালে ৪০ লক্ষ টাকা ও বাচ্চুর নতুন নিশান এক্স-টেইল গাড়ী (যার বর্তমান বাজার মূল্য ২৫ লক্ষ টাকা) নিয়ে বাচ্চুকে টঙ্গীর মিলগেইট কামাড়পাড়া সড়কে রেখে চলে যায়। এই ঘটনা বাচ্চু নিজে এসে এলাকায় প্রচার করতো এবং মাদক বেশি দামে বিক্রি করার নির্দেশ দিত। বাচ্চুর মাদক বিক্রির টাকার সিংহভাগ চলে যেত প্রশাসনের পকেটে। বাচ্চুকে গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের টিম ৪ বার গ্রেফতার করেছে। কিন্তু তাকে একবার ও জেল হাজতে যেতে হয়নি। প্রতিবারই মোটা অংকের অর্থ দিয়ে পার পেয়ে যায়। এছাড়া টঙ্গী মডেল থানায় বর্তমান নতুন ওসি ছাড়া বাচ্চুর সময় যতগুলো কর্মকর্তা এসেছেন। তাদের অনেকে জনপ্রতি ২ কোটি টাকা বাচ্চুর কাছ থেকে নিয়েছেন। সাবেক এক কর্মকর্তাকে ৬ লক্ষ টাকা দিয়ে একটি ফ্রিজ ক্রয় করে দিয়েছে। অনেক কর্মকর্তাকে এমন দামী দামী জিনিসপত্র উপহার দিত। যাতে সবাই তার পক্ষে থাকতো। প্রতি সপ্তাহে গাজীপুর জেলা গোয়েন্দা পুলিশকে দিতে হত এক কোটি টাকা। যার সিংহভাগ চলে যেত জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ের এক শ্রেণীর কর্মকর্তার পকেটে। ৪০ লক্ষ স্থানীয় প্রভাবশালী এবং জেলা মাদকদ্রব্য নিয়নন্ত্রন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাকে বাচ্চু দিত ৫ লক্ষ টাকা করে। প্রতি সপ্তাহে বাচ্চুর ঘুষ দিতে হতো দেড় কোটি টাকা। মাসে ৬ কোটি টাকা ঘূষ দিয়ে প্রকাশ্যে বিক্রি করতো হেরোইন ও ইয়াবা। শুধু মাদকেই শেষ নয় এলাকায় মাদক সেবনকারীরা যে সকল মালামাল চুরি, ছিনতাই করত সেই মালামালও বাচ্চুর কাছে বিক্রি করতে হতো। কেউ বিক্রি না করলে তাকে বস্তি এলাকায় প্রবেশ করে মাদক সেবন করতে দেয়া হতো না। বাধ্য হয়ে সবাই ভয়ে অন্যত্র বিক্রি না করে বাচ্চুর কাছে কমদামে বিক্রি করতো। বস্তির ককেজন দোকানি জনান, প্রতিদিন বিকাল হলে কালো গ্লাসের ২/৩টি দামী গাড়ী বস্তিতে বাচ্চুর ঘরে প্রবেশ করত। ওই গাড়ীগুলোতে বাচ্চুর ইয়াবা ও হিরোইন আসতো। গাড়ীগুলো টঙ্গী বাজারের গেইট দিয়ে প্রবেশ করত। আর বের হয়ে যেত ব্লেড ফ্যাক্টরি রোড দিয়ে। বাচ্চু বিপুল অর্থের মালিক হয়ে রাজধানীর উত্তরখান থানার ১২৪১ নম্বর মাস্টার বাড়ী এলাকায় একটি বাড়ি করেন, সেখানে ছোট স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন। এছাড়া নামে বেনামে গাজীপুর জেলার শ্রিপুর, মাওনা ও নিজ গ্রামে অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছে। বাচ্চুর বিরুদ্ধে টঙ্গী থানায় এ পর্যন্ত হত্যাসহ ১৪টি মামলা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *