বাংলাদেশ

বড় পরিসরে ইভিএম ব্যবহারের পথে ইসি

আগামীতে বড় পরিসরে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন-ইভিএম ব্যবহারের পথে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। রংপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচনে সফলতা পাওয়ার পর স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে ইসির উদ্ভাবিত নতুন ইভিএম। ইতিমধ্যে ২৬ জুন অনুষ্ঠেয় গাজীপুর সিটির ৬টি ভোটকেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আর আগামী ২৫ জুলাই অনুষ্ঠেয় আড়াইহাজার পৌরসভার পুরোপুুরি ইভিএম ভোট হবে। এরপর ৩০ রাজশাহী, বরিশাল ও সিলেট সিটিতেও ব্যবহার হবে ইভিএমের। আগামীতে যন্ত্রটির ব্যবহারের পরিধি বাড়াতে ২৫৩৫টি নতুন ইভিএম ক্রয় করা হয়েছে।    এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের (এনআইডি) মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, নতুন ইভিএম ব্যবহারের আমরা সফলতা পেয়েছি। আমাদের ১৯ সদস্যর কারিগরি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ইভিএম ক্রয় করা হয়েছে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার হবে। তবে কোন নির্বাচনে কতটি কেন্দ্রে ব্যবহার হবে-তা নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন।   ইসি সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ থেকে ইভিএম ক্রয় করছে ইসি। প্রাথমিকভাবে যে ২৫৩৫টি ইভিএম ক্রয়ের সিদ্ধান্ত ছিল তার মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৮০টি ইভিএম হাতে পেয়েছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। পরে আরো ১৫০০ সেট কেনার জন্য প্রস্তুতি চলছে। সংসদ নির্বাচনের আগে ১০ হাজারের উপর ইভিএম কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে ইউপির ৪২ হাজার কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ইভিএম গুলোর প্রতিটির দাম পড়ছে গড়ে প্রায় ২ লাখ টাকা। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন  নির্বাচনে ইভিএমে ব্যবহারে সফলতা পেলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে ছোট পরিসরে ইভিএম ব্যবহার করবে ইসি। এজন্য ইতিমধ্যে সংসদ নির্বাচনে ব্যালটের পাশাপাশি ইভিএম ব্যবহারের সুযোগ রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) সংশোধন করতে যাচ্ছে কমিশন।    গত বছরের অক্টোবর থেকে অনুষ্ঠিত সংলাপে বিএনপিসহ বেশকিছু রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি বিভিন্ন মহল থেকে ইভিএম ব্যবহারে আপত্তি জানানো হয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ এবং সমমনা দলগুলো ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে মতামত তুলে ধরে। ইভিএম নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে মতামত আসার পর গত বছরের ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন ইভিএম ব্যবহার করে কেএম নূরুল হুদা কমিশন। সর্বশেষ ১৫ মে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি নির্বাচনের দু’টি কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হয়।    ইসির সিস্টেম ম্যানেজার মোঃ রফিকুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন,গাজীপুর সিটির ৬টি কেন্দ্রে (১৫৪, ১৫৫, ১৭৪, ১৭৫, ১৯১ ও ১৯২ নম্বর ভোটকেন্দ্র) ইভিএম ব্যবহার করা হবে। প্রতিটি কেন্দ্রর দুটি করে ভোট কক্ষে ইভিএমে ভোট গ্রহণের পরিকল্পনা আছে। আড়াইহাজার পৌরসভায় ইভিএমে ভোট হতে পারে।  মূলত অধ্যাপক জামিলুল রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে ১৯ সদস্যর কারিগরি কমিটি ইভিএম ব্যবহারের নানা দিক বিশ্লেষন করে যে মতামত দিচ্ছে তার ভিত্তিতে এগুচ্ছে কমিশন বলে মত সংশ্লিষ্টদের।    ইভিএমের কারিগরি কমিটির জানায়, নতুন ইভিএমে ১০ রকমের সুবিধা সংযোজন করা হয়েছে। এই প্রযুক্তি নির্বাচনে ব্যবহারের মাধ্যমে ১০টি সুবিধা পাওয়া যাবে সেগুলো হল, ভোটগ্রহণের আগে মেশিন চালু না হওয়া ও মেশিন ছিনতাই হলেও অবৈধ ভোটদান বন্ধ, পাসওর্য়াড সুরক্ষিত থাকায় অনুমোদিত ব্যক্তির বাইরে মেশিন চালু করা সম্ভব নয়। ভোট শুরুর আগে-পরে শূন্য ভোটিং ও প্রিন্টিং করার সুবিধা। স্বয়ংক্রীয়ভাবে ফলাফল প্রিন্ট, ঘোষণা ও বিতরণ করার ব্যবস্থা। সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ব্যবহার উপযোগী ইভিএমের সুবিধাগুলোর মধ্যে ইভিএমকে ব্যবহার বান্ধব করার লক্ষ্যে ভোটার শনাক্তকরণ মেশিন এবং ভোটিং মেশিন দুটি একত্রিত করে একটি মেশিনে রূপান্তরিত করা। ব্যালট ইউনিট ক্যানসিল বোতামটি বাদ দেয়া, ব্যালট ইউনিটের ভোট প্রদানের বোতামগুলো বড় আকারের ও ভিন্ন রঙের করা এবং বোতামের পাশের বোতামটি একটু বড় আকারে করা। ভোট সম্পন্ন হওয়ার পর ভোটারের সন্তুষ্টির জন্য ধন্যবাদ শব্দ যুক্ত করা। ইভিএমের কাঠামো,টাচ স্ক্রিন, কি-বোর্ড এবং ভোটদান বোতামগুলোর মান উন্নত করা। ভোটার ভ্যারিফিকেশন মেশিনের সঙ্গে যুক্ত প্রজেক্টরটি মেশিনের মধ্যে সংযুক্ত (ইন বিল্ট) করা। কিউআর কোড মুদ্রণ বাদ দিয়ে একটি মেশিনের মাধ্যমে ভোটার শনাক্ত করা। ইভিএমের পুরো প্রটোকল, বিজনেস প্রসেস, সোর্সকোড ইত্যাদির ওপর রাইট আপ প্রস্তুত করা ইসির সার্বিক তত্ত্বাবধানে সংরক্ষণ করা এবং ইভিএম নিরাপদে ব্যবহারের জন্য মেশিন অনুযায়ী, সুরক্ষা বক্স ব্যবহার করা।    খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১/১১ এটিএম শামসুল হুদা কমিশন স্থানীয় নির্বাচনে ইভিএমের প্রচলন ঘটান। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এর সহায়তায় প্রথমে ২০১০ সালে এ প্রযুক্তির ৫৩০টি কেনা হয়। নির্বাচনে ব্যবহার করতে গিয়ে দেশের প্রধান  প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রস্তুত করা ইভিএমে নানা যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। পরে ২০১১ সালে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির (বিএমটিএফ) প্রস্তুতি করা ৭০০ ইভিএম কিনলেও এগুলো পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত ছিল না। এসব ইভিএম ক্রয়ে তত্কালীন ইসির ব্যয় হয়েছিল প্রায় ৫ কোটি টাকা। এটিএম হুদা কমিশন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ২১ নং ওর্য়াডে বুয়েটের ইভিএম ব্যবহার করে। পরে ২০১২ সালে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ সিটি, টাঙ্গাইলের একটি পৌরসভা ও নরসিংদী পৌরসভায় এ প্রযুক্তি ব্যবহার হয়। এরপর ২০১২ সালের  ফেব্রুয়ারিতে রকিব উদ্দিন কমিশন দায়িত্ব নেয়। তাদের মেয়াদে ২০১৩ সালের ১৫ জুন রাজশাহী সিটিতে ইভিএম ব্যবহার করে পুরো বিতর্কের মধ্যে পড়ে যায়। যন্ত্রে ত্রুটি দেখা দিলে ভোট স্থগিত করা হয়। পরবর্তীতে ব্যালটের মাধ্যমে ওই ইভিএম কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ হয়। বাধ্য হয়ে পুরাতন ইভিএম ব্যবহার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেন বিগত কমিশন। তবে, নতুন ইভিএমের প্রচলন চালু  রেখে যায়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে খান মো. নুরুল হুদার কমিশন দায়িত্বে এসে কমিটি করে পুরনো ইভিএমকে পরিত্যক্ত  ঘোষণা করে। ইসি নিজেরাই নতুন ইভিএম উদ্ভাবন করে। সেই ইভিএম ব্যবহার করে খুলনা নির্বাচনে সফলতাও আসে। এনআইডি সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহউদ্দিন ইসির নতুন ইভিএমের উদ্ভাবকদের অন্যতম। তিনি বিগত সময়ে নতুন ইভিএম নিয়ে কয়েকটি প্রেজেন্টেশন করেছিলেন। বর্তমানে তিনি বিএফটিএফেরর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন।    এ বিষয়ে মন্তব্য জানার জন্য যোগাযোগ করা হলে তার ব্যবহূত মোবাইল ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে বর্তমান এনআইডির মহাপরিচালক আরো বলেন, নতুন ইভিএমের ব্যবহার খরচ ব্যালট পেপারের চেয়ে অনেক কম। এটি ১০ থেকে ১৫ বছর ঝামেলা ছাড়াই ব্যবহার করা যাবে।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *