বাংলাদেশ

বাংলাদেশের বয়ন ঐতিহ্য

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য জামদানি বয়নশিল্প। এর নান্দনিক বিবর্তনের ইতিহাস দু’হাজার বছরেরও বেশি সময়ের। বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এই বয়নশিল্প। জামদানি নকশা সূচিকর্মে ফুটিয়ে তোলা হয় না, ছাপাও হয় না। তাঁতে সরাসরি বোনা; ব্যাহত ‘পোড়েন কৌশল’ ব্যবহার করেই শাড়িতে এই নকশা ফুটিয়ে তোলা হয়। সূক্ষ্ম নকশায় প্রতীয়মান স্বাতন্ত্র্য আর সামঞ্জস্যপূর্ণ জ্যামিতিক প্যাটার্ন। স্বচ্ছ জমিনে অস্বচ্ছতার মোহনীয়তায় ফুটিয়ে তোলা হয় প্রতিটি নকশা। বাবা থেকে ছেলে, ওস্তাদ থেকে শাগরেদ—শ্রুতি ইতিহাস আর হাতে কলমে শিক্ষার মধ্য দিয়ে পরম্পরায় প্রবাহিত হয়ে চলেছে পৃথিবীর একমাত্র বয়নকৌশল।   একসময় এই ভূখণ্ডের গণ্ডি ছাড়িয়ে এখানকার বয়নশিল্পের সুখ্যাতি দূর বিদেশে ছড়িয়েছেন বণিক সম্প্রদায়, যাদের অনেকেই ভিনদেশি। একসময়ে ঘরোয়া বাজার থেকে দেশীয় তাঁতবস্ত্র রপ্তানি এবং বাজার সম্প্রসারণের নেপথ্যে ছিল রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা। পরবর্তীকালে সওদাগরি সহায়তায় এই ধারা বজায় থাকে। আজকের বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশকে নিয়েই ছিল সুবা বাংলা। বলতে গেলে সেই মধ্যযুগ থেকে উনিশ শতকের সূচনা সময় পর্যন্ত এই অঞ্চলই ছিল বৈশ্বিক বস্ত্রবাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। অমসৃণ, মোটা বাফতা থেকে নিয়ে মিহিন মলমল তৈরি হয়েছে এই বাংলার গ্রামে গ্রামে, স্থানীয় বয়নশিল্পীদের নৈপুণ্যে। তারপর সেসব কাপড় নিয়ে কাফেলা চলেছে মালদা হয়ে বোখারা, ইস্পাহান আর সমরখন্দের পথে। প্রাচ্যে এই কাপড় গেছে সমুদ্রপথে; উপকূল বরাবর জাহাজে করে পাড়ি জমিয়েছে সেই ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। ইউরোপ, আমেরিকা আর আফ্রিকা—এই তিন মহাদেশে বাংলার হাতে বোনা কাপড়কে সমুদ্রপথে পৌঁছে দিয়েছে ইউরোপীয় বণিকরা। ঢাকা সেসময় সুপরিচিত ছিল ৪৭ ধরনের মলমল বস্ত্রের জন্য; এর মধ্যে দুররিয়াঁ, চাহারখান, তারান্দুম, তানজিব আর সামাদলাহার-এর চাহিদা ছিল সব থেকে বেশি। আরো ছিল জামদানি থান বা নকশাদার বা অলঙ্কৃত মলমল, আজও যা নারায়ণগঞ্জের বয়নশিল্পীদের গর্বিত ঐতিহ্য হিসেবেই রয়ে গেছে। এই বস্ত্র সেসময়ে খ্যাতি পায় মালবুস খাস হিসেবে; যা বিশেষত মোগল সম্রাটদের জন্য উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হতো। জামদানিই আবার ইউরোপ আর ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের রমণীদের বিশেষ প্রিয় হয়ে ওঠে। মোগল রাজদরবারের রমণীদের পোশাক কিংবা ইউরোপীয় নারীদের গাউন তৈরি হয়েছে অলঙ্কৃত মসলিন বা জামদানি বস্ত্রে।   এরপর সময় অনেক গড়িয়েছে। মোগলদের তাড়িয়ে ব্রিটিশরা রাজত্ব করেছে। তাদের বিতাড়নের পথ ধরে হয়েছে দেশভাগ। তবে আর এই টানাপোড়েনের মধ্যে জামদানি ছাড়া বিলুপ্ত হয়েছে সব ধরনের মসলিন। তবে এই জামদানিকে টিকিয়ে রাখার কৃতিত্ব আমাদের বয়নশিল্পীদের। অবশ্য বদলেছে বাস্তবতা। বহুমুখী অর্থনৈতিক উন্নয়ন অথবা বর্তমান চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বয়নশিল্পীরা নিজেদের উদ্ভাবনী দক্ষতার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন। সময়ের পটবদলে পরিবর্তন এসেছে শ্রম বিভাজনে : প্রথমত, এখন আর মেয়েরা সুতা কাটে না। অবশ্য হাতে সুতা কাটার প্রয়োজনও আর হয় না। বরং নারায়ণগঞ্জের পাইকারি বাজার কিংবা স্থানীয় বাজার থেকে সুতা কিনে আনা হয়। দ্বিতীয়ত, মেয়েরা এখন ছেলেদের মতোই তাঁতে বসে। তৃতীয়ত, লেখাপড়া শিখে অন্য পেশা বেছে নেয়ার অভিপ্রায়ে বয়নপরিবারের কিশোররা শিক্ষানবিস হিসেবে তাঁতে না বসে বরং স্কুলে যাচ্ছে। ফলে আশপাশের জেলার তুলনায় কম সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের খুঁজে পেতে নিয়ে আসা হচ্ছে শিক্ষানবিস হিসেবে। ওস্তাদ কারিগররাই তাঁদের কারখানায় এখন কারিগর নিয়োগ দিয়ে থাকেন; এজন্য স্বাধীন বয়নশিল্পীর সংখ্যা অনেক কমে এসেছে।   ভোক্তাচাহিদা মেটাতে বয়নশিল্পীরা পণ্য বহুমুখীকরণে সফল হয়েছেন। ফ্যাশন হাউজগুলোতে  শাড়ির পাশাপাশি এখন পাওয়া যায় কামিজ, ফতুয়া আর ওড়না। যদিও চাহিদার শীর্ষেই এখনো রয়েছে শাড়ি।   বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তন বস্ত্রবয়নশিল্পকে প্রভাবিত করেছে। হস্তচালিত তাঁত ক্রমেই প্রতিস্থাপিত হচ্ছে যন্ত্রচালিত তাঁতে। পরোক্ষে, জামদানি শাড়ির দাম মধ্যবিত্তের নাগাল ছাড়িয়েছে। ফলে কম দামে জামদানির চাহিদা মেটাতে বয়নশিল্পীরা কম কাউন্টের সুতা বা মোটা সুতা ব্যবহার করছে। এসব সুতায় বোনা জামদানিতে সঙ্গতকারণেই বদলে যাচ্ছে মূল মোটিফের আকার। জামদানি শাড়িকে আরো নষ্ট করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে ডিজাইনারদের মধ্যে। তারা জামদানির প্রকৃত ঐতিহ্যের ধার না ধেরে এর পাড়ে লেস লাগাচ্ছে, জমিনে করছে মিরর অ্যামব্র্রয়ডারি। এদিকে আবার টাঙ্গাইলের বয়নশিল্পীরা জামদানি মোটিফকে জ্যাকার্ড তাঁতে কিংবা যন্ত্রচালিত তাঁতে ব্যবহার করে মূল মোটিফের আকারই বদলে ফেলছেন।   অন্যদিকে জামদানি বয়নশিল্পীদের বেশিরভাগেরই নেই সরাসরি বাজার সংযোগ; তুলনামূলক কম উত্পাদনব্যয়ের যন্ত্রচালিত তাঁতের শাড়ির সঙ্গে রয়েছে তীব্র প্রতিযোগিতা, আরো আছে হতাশাজনক মজুরি—এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এসবই হচ্ছে অন্তরায়। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জের তিনটি উপজেলা রূপগঞ্জ, সোনারগাঁ আর সিদ্ধিরগঞ্জের জামদানি গ্রামগুলোর বয়নশিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন। এদিকে ভৌগলিক নির্দেশক সুরক্ষা আইন জামদানিকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়া সব মানদণ্ড পূর্ণ করায় ইউনেস্কোর ইন্টার-গভর্নমেন্টাল কমিটি ফর সেফগার্ডিং অব ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ সর্বসম্মতিক্রমে জামদানি বয়নশিল্পকে তালিকাভুক্ত করেছে। তবে কেউই এই শিল্প সংরক্ষণে কোনো কর্মপরিকল্পনা দিতে পারেনি। এদিকে ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর বাকুতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে, ইউনেস্কো বাংলাদেশের জামদানি বয়নশিল্পকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই স্বীকৃতির ফলে বয়নশিল্পী এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে জামদানি সুরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখা সম্ভব। এমনকি জামদানির বয়নকৌশল এবং এর বিপণনব্যবস্থা সম্পর্কিত জ্ঞান তাঁতিদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে এই শিল্পকে তার আদিরূপে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে এই সদিচ্ছার প্রতিফলন ঘটানো যেতে পারে। বংশপরম্পরায় জামদানি বয়নশিল্পীরা তাঁদের পেশায় রয়ে গেছেন। একে বলা যেতে পারে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ বয়ন উত্তরাধিকারের এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত। এহেন ধারাবাহিকতায় এই শিল্পের ঐতিহাসিক মূল্য আরো স্পষ্ট। দেশের ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের অনন্য উপাদানও নিহিত এই প্রক্রিয়ায়। জামদানি নকশা এবং বয়নকৌশলগত জ্ঞানের চর্চা ও বয়নশিল্পীদের দক্ষতা প্রকাশের মধ্যে দিয়ে ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের সামাজিক-সাংস্কৃতিক গুরুত্বের দৃশ্যমানতা আর সচেতনতা নিশ্চিত হবে। বস্তুত এক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই সৃজনদক্ষতা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ভোক্তাদের জামদানির প্রতি উত্সাহিত করবে; যা পরোক্ষে বিশ্বের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অংশ হিসেবেই জামদানিকে টিকিয়ে রাখবে। এবং এর অনিঃশেষ সামাজিক এবং অর্থনৈতিক প্রভাব বয়নশিল্পীদের জীবনমান বদলের অনুঘটক হবে।   লেখক : ফ্যাশন বিশ্লেষক  

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *