ফিচার্ড পোস্ট

দেশ ভ্রমণে নাজমুন নাহারের সেঞ্চুরি

বাংলাদেশের তরুণী নাজমুন নাহার। ভ্রমণ তার নেশা। এরমধ্যে বিশ্বের ১০০টি দেশে উড়িয়ে দিয়ে এসেছেন স্বদেশের পতাকা। গত ১ জুন তার ভ্রমণের তালিকায় জিম্বাবুয়েকে যুক্ত করে নিলেন শততম দেশে হিসেবে। ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি ঘুরেছিলেন পৃথিবীর ৯৩টি দেশ। চলতি বছরের মে ও জুন মাসে তিনি আরো ৭টি দেশ ঘুরেছেন। দেশগুলো হলো- ইথিওপিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, তাঞ্জানিয়া, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে।   গত ১৭ বছর ধরে তিনি পৃথিবীর পথে পথে বাংলাদেশের পতাকা হাতে ঘুরছেন। শতদেশ ভ্রমণ করার পর তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘আজকের এই মুহূর্ত শুধু আমার নয়, এই গৌরবময় মুহূর্তের অংশীদার বাংলাদেশের সব মানুষ!’ এ বছরের ০৩ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের শনিবারের বিশেষ ক্রোড়পত্র ‘ভিন্নচোখে’র প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে স্থান পান এই ভ্রমণপিপাসু। নিজের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন ইত্তেফাকে। ‘শততম দেশ ভ্রমণের পথে পথে’ লেখাটি আবারো ইত্তেফাক পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো-   ইথিওপিয়া থেকে জিম্বাবুয়ে শততম দেশে যাত্রা। জীবনের কিছুটা সময় আফ্রিকার কয়েকটি দেশে কাটানোর সুযোগ হলো, যেন এক ভিন্নরকম অভিজ্ঞতা, তা আর অন্য কোথাও পাইনি। আজ বলতে ইচ্ছে করছে। বেশ কিছুদিন ধরে আফ্রিকার পথে পথে আমার সাড়ে ৪শ’ ঘণ্টার বাস।   জার্নি, পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় নির্ঘুম রাত। ঘণ্টার পর ঘণ্টা না খেয়ে থাকার মুহূর্ত, অন্ধকারে মধ্য রাতে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অভিযাত্রা। আফ্রিকান ভিন্ন ভিন্ন আদিবাসীর সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের সংস্কৃতিকে জানা। কখনো গরুর কাঁচা মাংস খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছিল আমাকে। আজ তারই বিভিন্ন অভিজ্ঞতা নিয়ে রেকর্ড হলো আমার ১০০তম দেশটি। ইথিওপিয়া আমার চষে বেড়ানো দেশগুলোর একটি। ভোর ৬টা, সূর্য মাত্র উঁকি দিয়েছিল ইথিওপিয়ার আকাশে। আমার প্লেনটি আদ্দিস আবাবা শহরে মাত্র ল্যান্ড করলো, ভেতরে আমার অনেক আনন্দ হচ্ছিল। বাংলাদেশের পতাকা হাতে আমি ইথিওপিয়ার মাটিতে নামছি, ইমিগ্রেশন ক্রস করেই দেখলাম ইথিওপিয়া মিনিস্ট্রি অব ট্যুরিজম বোর্ডের ট্যুর গাইড আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই আমরা রওনা দিলাম এনততো মাউন্টেনের দিকে। পাহাড়ের অনেক ওপরে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে উঠেছিলাম। তারপর জোরে জোরে নিশ্বাস ছেড়ে বললাম, বাংলাদেশের পতাকা এখন আমার যাত্রার ৯৪তম দেশ ইথিওপিয়াতে। শুধু তাই নয়, সেখানে পাহাড়ি ইথিওপিয়ানদের জীবনযাত্রা, তাদের কৃষ্টি, কালচার দেখার সুযোগ হয়েছিল। পাহাড়ি ভ্যালি থেকে নেমে এলাম শহরের দিকে, তারপর গেলাম ইথিওপিয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়াম। সেখানেই পৃথিবীর সবচেয়ে আদি মানবীর ফসিল দেখা হলো।   ৩.৩ মিলিয়ন বছর আগের আদি মানবী লুসির ফসিল এই মিউজিয়ামে রয়েছে। খুব আবেগাপ্লুত হলাম, আমাদের কত জেনারেশন পূর্বের সেই আদিমানব। এছাড়া পুরো মিউজিয়ামজুড়ে রয়েছে ইথিওপিয়ানদের পুরনো ইতিহাস ও সংস্কৃতির স্মৃতিচিহ্ন। তারপর চলে এলাম আফ্রিকার সবচেয়ে বড় খোলা মার্কেট দেখার জন্য শহরের ভেতর। সেখানে দেখলাম মেয়েরা হ্যান্ডিক্র্যাফট দোকানগুলোর ভেতর নিজেরাই তৈরি করছে গলার মালা, হাতের ব্রেসলেট, ঘর সাজানোর বিভিন্ন স্যুভেনিরসহ অনেক কিছু। তাদের নিজ হাতের তৈরি নিপূণ কাজ দেখে মুগ্ধ হলাম। কেবরাব (গাইড) আমাকে নিয়ে গেল একটা লোকাল ইথিওপিয়ান রেস্টুরেন্টে। আমি কিছু বলার আগেই ও নিজে খাবারের অর্ডার দিলো। বললো- আজ তোমাকে অনেক মজার লোকাল খাবার খাওয়াবো। আমিতো মনে মনে খুবই খুশি, বোধহয় অনেক মজার খাবার। এদিকে ক্ষুধায় আমার পেট জ্বলছে। একটু পরেই দেখি একটা টিনের প্লেটের মধ্যে কয়েক টুকরা গরুর কাঁচা মাংস, পাশে একসাইডে টকটকে লাল বাটা মরিচ, সঙ্গে লোকাল রুটি ইনজেরা, দেখতে আমাদের দেশের বড় পাতলা চিতই পিঠার মতো। আমিতো দেখে অবাক।   সঙ্গে সঙ্গে কেবরাবকে বললাম, ‘আর ইউ জোকিং উইথ মি? ও হেসে বললো খাও অনেক মজা, এটা আমাদের লোকাল ফুড। আমি বললাম, গরুর কাঁচা মাংস তোমাদের লোকাল ফুড? ও আবার বললো, এটা আমাদের কাছে সবচেয়ে মজার খাবার। ওই যে ইনজেরা ব্রেড দেখতে পাচ্ছো, ওই ব্রেডটি যদি হ্যাভেনে না থাকে আমরা হ্যাভেনেও যেতে চাই না! আমি মুখ টিপে হাসলাম খিদে পেটে নিয়ে। ভাবলাম আমরা যেমন ভাত খাওয়ার পাগল, ইথিওপিয়ানরা তেমনি ইনজেরা রুটি আর গরুর কাঁচা মাংসের পাগল। কি আর করা, আমার আর কোনো উপায় ছিল না। ও বারবার আমাকে তাদের লোকাল ফুড ট্রাই করার জন্য অনুরোধ করলো, তাই কষ্ট করে অনুরোধের ঢেঁকি গিলতে থাকলাম। ও নিজেই ইনজেরা ব্রেড থেকে এক টুকরো ছিঁড়ে সঙ্গে এক টুকরো মাংস আমাকে আলাদা করে দিয়ে বললো, খাও। খেলাম! ব্রেডটি ছিল খুবই টক, সঙ্গে মরিচ সব মিলিয়ে ক্ষুধা পেটে খেয়ে ফেললাম কয়েক টুকরো। কাঁচা মাংস খাওয়ার ভিন্নরকম এক অনুভূতি। ও বারবার জানতে চাইছে কেমন লাগলো খেতে? আমি বললাম, এক সময়ের আদিম পূর্বপুরুষ আদিবাসীদের আমি আমার ভেতর দেখতে পাচ্ছি। পাথরে পাথরে ঘর্ষণের মাধ্যমে আগুন সৃষ্টির আগে মানুষ তো কাঁচা মাংস খেয়ে থাকতো, আমি সেই অনুভুতি পেলাম।   রাতে ইথিওপিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের পাশের বিল্ডিংয়ের গেস্ট হাউজে আমার থাকার ব্যবস্থা হলো। ডিপ্লোম্যাট এরিয়া, পাশেই ইউএন-এর অফিস, নিজেকে একটু নিরাপদ মনে হলো। প্রচণ্ড ঘুমে কাতর আমার দু-চোখ। ব্যাকপ্যাক রেখেই হেলে পড়লাম বিছানায়। ভোর হলো, পরের দিনও সারাদিন আমি নিজেই টইটই করে ঘুরলাম। ভোরে ইথিওপিয়ান ম্যারাথন ফেস্টিভ্যালে অংশগ্রহণ করলাম। শহরের সব মানুষ রাস্তায়, যেন এক আনন্দ মেলা। সেখানে অনেক ইথিওপিয়ানদের সঙ্গে পরিচয় হলো। তারা আমাদের বাংলাদেশকে চেনে, আমাদের দেশের অনেক বিষয়ে জানতে চাইলো। আমি আমার দেশ সম্পর্কে তাদের জানালাম। গর্বের সঙ্গে বললাম আমার দেশের ইতিহাস।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *