বাংলাদেশ

দেশে নির্যাতনের শিকার ৫৭ শতাংশ শিশুশ্রমিক

  দরিদ্র শিশুদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু শ্রমের সঙ্গে জড়িত। তারা তাদের অধিকার সম্পর্কে জানে না। ফলে কাজ করতে এসে প্রতিনিয়ত নির্যাতনে শিকার হয়। সেই নির্যাতন একেক সময় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, শিশুরা মৃত্যু মুখে পতিত হয়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিলসেন কোম্পানির, বাংলাদেশ শাখার এক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু শ্রমিকদের শতকরা ৫৭ ভাগ নির্যাতনের শিকার। তারা ১১ বছর বয়স থেকেই বিভিন্ন কাজের সঙ্গে জড়িত। তাদের শতকরা ৭৯ ভাগ প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। ‘বাংলাদেশের অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে শিশু শ্রম পরিস্থিতি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়।   অভিভাবকসহ সমাজ-রাষ্ট্র-পরিবার সবার দায়িত্ব, শিশুদের অধিকার রক্ষা করার কথা থাকলেও কেউই সেটা করতে পারছে না। ফলে শিশুরা প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে, রক্তাক্ত হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে তারা নির্মম হত্যার শিকার হচ্ছে। যার দুই একটি ঘটনা গণমাধ্যমের কারণে প্রকাশিত হচ্ছে। আর এ ধরনের বেশিরভাগ ঘটনাই থেকে যাচ্ছে অগোচরে।   দারিদ্র্যতার কারণে দেশের কয়েক লাখ শিশু বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। এরা কর্মক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য মতে, ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৮ মাসে ২২২ শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এরমধ্যে ৩৬টি শিশুকে নির্যাতন করা হয়েছে যাদের অধিকাংশই দরিদ্র শ্রমজীবী শিশু। এর আগে ২০১৬ সালে ১০৬টি শিশুকে এবং ২০১৫ সালে ৯০টি শিশুকে চুরির অপবাদে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়েছে।    সম্প্রতি ২৬ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহের গৌরীপুরে চোর সন্দেহে সাগর নামের পনের বছরের এক কিশোরকে খুঁটিতে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। গৌরীপুর উপজেলার ডৌহাখলা ইউনিয়নের চরশ্রীরামপুর গ্রামে গাউছিয়া মত্স্য প্রজনন কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। হ্যাচারির মালিক আক্কাস আলী হ্যাচারির পাম্প চুরির সন্দেহে তাকে প্রায় ২ ঘণ্টা খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পেটায়। সাগর ভাঙাড়ি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিল। ওই সময় কেউ কেউ মোবাইল ফোনে ছবি তুললেও সাগরকে বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। সাগর বাঁচার জন্য করুণ আর্তনাদ করলেও প্রভাবশালী আক্কাছ আলী ও তাঁর ভাইদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস করেনি কেউ।   একই কায়দায় ২০১৫ সালের ৮ জুলাই সিলেটের কুমারগাঁওয়ে চোর অপবাদে শিশু সামিউল আলম রাজনকে (১৩) খুঁটিতে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ১৭ জুলাই সিরাজগঞ্জে কামারখন্দ উপজেলার ১৩ বছরের শিশু শ্রমিক কাইয়ুম হোসেনের পায়ুপথে বাতাস ঢুকিয়ে হত্যার চেষ্টা করে জাকির হোসেন নামের আরেক শ্রমিক।   ৯ আগস্ট সেন্ডেল চুরির অপরাধে ১১ বছরের শিশু পলি বেগমকে বান্দরবানের লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টয়লেটে আটকে রেখে নির্যাতন করে এক নারী চিকিত্সক। একই দিনে কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় মোবাইল ফোনসেট চুরির অপবাদে আম গাছের সঙ্গে বেঁধে ৭ বছরের এতিম শিশু জুয়েল ও আসিফকে পিটিয়েছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। একই দিনে, নওগাঁর রানি নগরে চুরির অপবাদ দিয়ে পায়ের পাতা ও আঙ্গুলে সুঁচ ঢুকিয়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে শরিফুল ইসলাম (১৫) নামে এক কিশোরকে ১৬ ঘণ্টা আটকে রেখে নির্যাতন করে। ১৩ আগস্ট, নরসিংদীতে মা দ্বীপ্তি ভৌমিককে হত্যাকারী বানাতে তারই ছেলে প্রীতম ভৌমিককে পুলিশ থানায় উল্টো করে ঝুলিয়ে তিনদিন ধরে নির্যাতন করে।   এসব ঘটনায় দোষীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে নির্যাতনে শিকার এসব শিশুও মৃত্যুর মুখে পতিত হতে পারতো বলে জানান সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সমাজে এ ধরনের একধিক ঘটনা ঘটলেও এখনো সংঘবদ্ধভাবে কেউ এ ধরনের ঘটনাগুলোতে প্রতিবাদ জানায় না। সামপ্রতিক সময়ে এ ধরনের নিষ্ঠুর শিশু নির্যাতনের প্রবণতা বেড়েই চলছে। যা অত্যন্ত উদ্বেগের।    এ প্রসঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক বলেন, আইনের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা থাকে তাহলেই কিন্তু এই শিশুদের উপরে নির্যাতন বন্ধ করা যাবে।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *