আন্তর্জাতিক

ইরাক নির্বাচন নিয়ে যা জানা দরকার

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

আগামীকাল শনিবার ইরাকে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে গঠন হবে নতুন সরকার। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হস্তক্ষেপের পর এটা হবে দেশের চতুর্থ পার্লামেন্টারি নির্বাচন।   চার বছর আগে নির্বাচনের সময় ইরানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চরম রূপ ধারণ করেছিল। তাই এবার অনেক প্রার্থীই একটি ঐক্যবদ্ধ, মিশ্র সম্প্রদায় ভিত্তিক নির্বাচনী প্রচারণার দিকে ঝুঁকেছেন। তবে ২০১৪ ও ২০১০ সালের নির্বাচনের চেয়ে এইবারের নির্বাচনটি কিছুটা ভিন্ন। পূর্বের নির্বাচনগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো জোট গঠনের দিকে নজর দিলেও এবার রাজনৈতিক পটভূমি ছড়িয়ে আছে আন্ত-সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিভাজন।   যে কারনে গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন গত বছর দেশটিতে জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস’র পরাজয়ের পরে এটাই ইরাকে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। অল্প কিছু পরিবর্তন ছাড়া এইবারের নির্বাচনেও আগের দলগুলোই আধিপত্য করবে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিবর্তন এসেছে ২০০৫ সালে ‘ইউনাইটেড ইরাকি এলায়েন্স’ নামে নির্বাচনে লড়া শিয়া-ভিত্তিক দলগুলোর জোটে। বর্তমানে ওই জোট ভেঙ্গে গঠিত হয়েছে নতুন পাঁচটি জোট।তাদের ভঙ্গুর প্রকৃতি দেখে বোঝা যায় যে, এইবার সরকার গঠনের প্রক্রিয়াটি হবে দীর্ঘ ও জটিল। মার্চ মাসে দেশজুড়ে করা এক জরিপ অনুসারে, বর্তমানে ইরাকের প্রধান সমস্যাগুলো হচ্ছে, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি। নির্বাচনী প্রক্রিয়া নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৩২৯ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন। তাদের ভোটে নির্বাচিত হবেন প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী। এইবারের নির্বাচনে ৮৭টি দল থেকে অংশ নিয়েছে মোট ৬ হাজার ৯০০ প্রার্থী। এর মধ্যে নারী প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত ২৫ শতাংশ বা ৮৩টি আসনের জন্য লড়ছেন ২ হাজার ১১জন। এছাড়া ৯টি আসন বরাদ্দ রয়েছে সংখ্যালঘুদের জন্য। নির্বাচিত প্রার্থীরা টানা ৪ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবেন।   প্রধান শিয়া জোটগুলো ধারণা করা হচ্ছে, ইরাকের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হবে প্রধান শিয়া দলগুলো থেকে। এই দলগুলোই ইরাকের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এইবার শিয়া-ভিত্তিক দলগুলো ৫টি আলাদা জোটে বিভক্ত। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল আবাদি পুন নির্বাচনের জন্য লড়বেন নাসর কোয়ালিয়েশন (জোট)-এর প্রার্থী হিসেবে। দ্বিতীয় জোট, দাওলাত আল-কানুন’র হয়ে লড়বেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী নৌরি আল-মালিকি। আরো দুটি প্রধান জোট হচ্ছে, ইসলামিক সুপ্রিম কোয়ালিয়েশন অফ ইরাক থেকে বিভাজিত হয়ে গঠিত ফাতাহ কোয়ালিয়েশন ও হিকমা কোয়ালিয়েশন । হাদি আল-আমিরি ও আমার আল-হাকিম যথাক্রমে দল দুটি নেতৃত্ব দিচ্ছেন।  সর্বশেষ দলটি হচ্ছে, আল-সাইরুন।   কুর্দি  ভোট ২০১০ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে নিষ্পত্তিকারক ভূমিকা রেখেছিল কুর্দিরা। কিন্তু ২০১৭ সালে স্বাধীনতা গণভোটের মধ্যে দিয়ে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতায় আগের ধারাবাহিকতা বজায় থাকার সম্ভাবনা কম। কুর্দি অঞ্চলে ইরাকের হস্তক্ষেপ সম্প্রদায়টির মধ্যে বিভক্তির সৃষ্টি করেছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে, এই নির্বাচনে তাদের ভূমিকা আগের দুইবারের মতন লক্ষণীয় হবেনা। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইব্রাহিম মারাশি বলেন, কুর্দি ডেমোক্রেটিক পার্টি (কেডিপি) অক্ষুণ্ণ থাকলেও দলটি খুব সম্ভবত এর নেতা মাসুদ বারজানি’র স্বাধীনতা গণভোটের ব্যর্থ চেষ্টার কারণে ক্ষতির শিকার হবে। মারাশি আরো বলেন, একই সময়ে দ্য পেট্রিয়োটিক ইউনিয়ন অফ কুর্দিস্তান(পিইউকে) অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত হয়ে আছে। একারণে তাদেরও ভোট হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিভাজনগুলোর কারণে বেশ কিছু ছোট দলও নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় নামবে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, গোরান (পরিবর্তন), ডেমোক্রেসি এন্ড জাস্টিস পার্টি ও কুর্দিস্তান ইসলামিক গ্রুপ।   সুন্নি ভোট বাকি সম্প্রদায়গুলোর মতন সুন্নি নেতৃত্বেও বিভাজন বিদ্যমান। তবে তার চেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার বৈধতা।  সুন্নি দলগুলোকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হচ্ছে, আল-কারার আল ইরাকি। এর নেতৃত্বে আছেন ইরাকের তিন ভাইস প্রেসিডেন্টের একজন, ওসামা আল-নুজাফি এবং তার ভাই ও ইরাকের গভর্নর, আথেল আল নুজাফি। অপর দলটি হচ্ছে, ওয়াতানিয়া এলায়েন্স। এর প্রতিনিধিত্ব করছেন পার্লামেন্টের বর্তমান স্পিকার সালিম আল-জাবুরি, সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী সালেহ আল-মুতলাক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াদ আল্লাওয়ি। মারাশির ভাষ্য, আরব সুন্নিদলগুলো এইবারের নির্বাচনে ঐকবদ্ধ্য হয়ে লড়ার সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। এ থেকেই বোঝা যায় যে, তাদের মধ্যে তীব্র বিভাজন বিদ্যমান। বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, মসুল ও অন্যান্য সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলোতে সুন্নি দলগুলোর চেয়ে আবাদি’র নাসর জোটই বেশি ভোট পাবে। মসুল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক আহমেদ তারিক বলেন, দেশটি সবে মাত্র আইএস’র প্রভাব থেকে মুক্তি পেয়েছে। এতে করে নির্বাচনের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন এসেছে। সবাই পরিবর্তনের আশায় আছে। আর তাদের কাছে এজন্য আবাদি’ই সবচেয়ে উপযুক্ত প্রার্থী। কেননা, তার সরকারের আমলেই আইএস পরাজিত হয়েছে।   ভোটের পর যা হবে ইরাকের আরব সুন্নিদের জন্য আবাদি’কে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়াটা সহজ। তাদের দৃষ্টিতে আবাদি একজন অপেক্ষাকৃত কম সাম্প্রদায়িক মনোভাবসম্পন্ন । এছাড়া,  আল-মালিকি বা আল-আমিরির মতন অন্যান্য সুন্নি নেতাদের তুলনায় আবাদি সুন্নিদের প্রয়োজনে দ্রুত সাড়া দেন। কিন্তু এমনটা হলে, কুর্দরা খুব একটা খুশি হবেনা। স্বাধীনতা গণভোটের সময় তারা আবাদি’র কট্টর অবস্থানের বিরোধী ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাদি দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ী হলেও সরকার গঠন করতে শিয়া-ভিত্তিক দলগুলোও পার্লামেন্টের একটা অংশের দখলে থাকবে। আল-আমিরির ফাতাহ জোট, আবাদির নাসর জোটের চেয়ে ইরানের সঙ্গে বেশি সম্পৃক্ত। ইরাকে শিয়া রাজনীতির প্রভাব ব্যাপক। তাই, আগামী সরকারের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থাকছে ফাতাহ জোট। (আল জাজিরা অবলম্বনে)  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *