বাণিজ্য

অনলাইনে ভুয়া ভ্যাট নিবন্ধনের ছড়াছড়ি, রাজস্ব ফাঁকির শঙ্কা

  ব্যবসায়ের হিসাবে স্বচ্ছতা আনতে ও কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে সরকার অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করেছে। গত জুলাই থেকে পূর্বের নিয়মে আর ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর দেওয়া হচ্ছে না। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়া ও ভ্যাট পরিশোধের ক্ষেত্রে বেশকিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।   বর্তমানে অনলাইনে নিবন্ধন নেওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অনেকগুলোই ভুয়া বলে প্রমাণ হয়েছে। আবার অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাবসহ ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে নিবন্ধন নিয়েছে। এর ফলে ভ্যাটের পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানিতে শুল্ক-কর ফাঁকির আশঙ্কা করছে এনবিআরের মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলো। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ ধরণের রাজস্ব ঝুঁকির আশঙ্কার কথা জানিয়ে একাধিক মাঠ পর্যায়ের অফিস থেকে এনবিআরকে লিখিতভাবে অবহিত করা হচ্ছে।   সূত্র জানায়, সম্প্রতি ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেটের আওতাভুক্ত কয়েকটি এলাকায় অনলাইনে নিবন্ধন নেওয়া বেশকিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সরেজমিনে যাচাই করে। তাতে নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বড় ধরণের গলদের তথ্য উঠে আসে। রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও সংলগ্ন এলাকা সাভার, ধামরাই এবং মানিকগঞ্জে ৩১০টি নিবন্ধন নেওয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহে সরেজমিনে যাচাই করা হয়। তাতে দেখা যায়, ১৬০টি প্রতিষ্ঠানেরই অস্তিত্ব নেই! অস্তিত্ব পাওয়া গেল মাত্র দেড়শ’ প্রতিষ্ঠানের। শুধু ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনারেট অফিসের ক্ষেত্রেই এমন নয়, অন্যান্য অফিসেও আওতাধীন এলাকায়ও এ ধরণের অনিয়ম পাওয়া গেছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এনবিআরের হিসাবে, বর্তমানে অনলাইনে নিবন্ধন নেওয়া প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার।   নিবন্ধন নেওয়ার সময় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিকের টিআইএন (করদাতা সনাক্তকরণ নম্বর), ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বাড়িভাড়ার চুক্তিপত্র টেলিফোন বা ই-মেইলসহ বেশকিছু তথ্য দিতে হয়। এসব তথ্যের বেশকিছুই ভুল বা ভুয়া হিসেবে প্রমাণ পেয়েছে সংশ্লিষ্ট ভ্যাট অফিসগুলো। সূত্র জানিয়েছে, এনবিআরের একটি ভ্যাট অফিস থেকে ২৯টি ব্যাংকে ৬ হাজার ৮৬৩টি ভ্যাট নিবন্ধনে দেওয়া ব্যাংক হিসাব যাচাই করা হয়। তাতে দেখা যায়, সঠিক ব্যাংক হিসাব পাওয়া গেছে ৪ হাজার ৯৪টি। বাদবাকি হিসাবের ক্ষেত্রে ভুয়া, ভুল, ভুল শাখা ও বন্ধ হিসাব পাওয়া গেছে।   সম্প্রতি ঢাকা পশ্চিম ভ্যাট কমিশনার এস এম হুমায়ুন কবীর অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধনে এরকম ১৬ ধরণের সমস্যা চিহ্নিত করে এনবিআরে পাঠিয়েছেন। এতে রাজস্ব ফাঁকির আশঙ্কার কথা তুলে ধরা হয়।   বর্তমানে অনলাইনে নিজে নিজে নিবন্ধন গ্রহণের ক্ষেত্রে একই ঠিকানায় আগের কোন নিবন্ধন রয়েছে কিনা বা ঠিকানা ও প্রদত্ত তথ্য সঠিক কিনা, তা যাচাইয়ের সুযোগ নেই। ফলে বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা যে কোন ঠিকানা ব্যবহার ও স্থান পরিবর্তনের কারণে স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে ইচ্ছেমত অন্য এলাকায় নতুন নিবন্ধন গ্রহণ করতে পারে। এতে পূর্বের দায়-দেনা বা অন্য কোন সরকারি পাওনা থাকলে তা জানা সম্ভব হয়না। অন্যদিকে বিদ্যমান অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থায় একটি টিআইনের অধীনে একাধিক প্রোপ্রাইটরশিপ ব্যবসা, কেন্দ্রীয় বা শাখা হিসেবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন (বিআইএন) নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এরকম একাধিক বিআইএনের মাধ্যমে একাধিক আমদানি বা রপ্তানি সনদ (আইআরসি বা ইআরসি) গ্রহণ করে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে।   কোন কোন প্রতিষ্ঠান উৎপাদনকারী হিসেবে নিবন্ধিত হলেও সরেজমিন যাচাইয়ে উৎপাদনকারী হিসেবে পাওয়া যায়নি। আবার কোন কোন প্রতিষ্ঠান প্রকৃত টার্নওভার (বার্ষিক বিক্রি) গোপন করে ভ্যাটের আওতায় নিবন্ধিত না হয়ে টার্নওভার করের আওতায় নিবন্ধিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও সরকারের প্রকৃত রাজস্ব আদায় সম্ভব হচ্ছে না।   এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ভুয়া নিবন্ধন কিংবা ভুল তথ্যে নিবন্ধন নেওয়ার ফলে ভবিষ্যতে এ ব্যবস্থায় জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। কেননা ভুয়া নিবন্ধনের কারণে প্রকৃত নিবন্ধনকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও জানা সম্ভব হয়না। তবে অনলাইন ব্যবস্থা পুরোদমে শুরু হওয়ার পর ভুয়া নিবন্ধন  রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *